প্রকাশিত: ১৫ জুলাই ২০২৬ , ১০:২৪ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
ফুটবলের কিছু ম্যাচ কেবল ৯০ মিনিটের লড়াই নয়, বরং ইতিহাস, আবেগ এবং একটি জাতির স্মৃতিকে বহন করে। বিশ্ব ফুটবলে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড তেমনই এক দ্বৈরথ, যার প্রতিটি অধ্যায় লেখা হয়েছে যুদ্ধ, বিতর্ক, প্রতিশোধ এবং কিংবদন্তির গল্পে। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে দীর্ঘ ২৪ বছর পর আবারও মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল। ফলে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে এই ঐতিহাসিক বৈরিতার গল্প।
আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের ফুটবল বৈরিতার শিকড় মাঠের অনেক বাইরের। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ দুই দেশের সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। আর্জেন্টিনায় যা মালভিনাস নামে পরিচিত, সেই দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ৭৪ দিনের এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। যুদ্ধে প্রাণ হারান ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন এবং ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনাসদস্য। শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয় যুক্তরাজ্য।
তবে যুদ্ধ শেষ হলেও দুই দেশের মানুষের মনে রয়ে যায় ক্ষোভ ও বেদনার স্মৃতি। আর্জেন্টিনার উপকূল থেকে প্রায় ৩০০ মাইল দূরে অবস্থিত এই দ্বীপপুঞ্জকে দেশটি নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে আসছে। অন্যদিকে, ১৮৩৩ সাল থেকে ব্রিটেন সেখানে শাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং ২০১৩ সালের গণভোটে প্রায় ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ বাসিন্দা ব্রিটিশ ভূখণ্ড হিসেবেই থাকার পক্ষে মত দেন। যদিও সেই গণভোট নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর, ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয় দুই দল। অনেক আর্জেন্টাইনের কাছে এটি ছিল প্রতীকী প্রতিশোধের ম্যাচ, আর ইংল্যান্ডের জন্য মর্যাদা রক্ষার লড়াই।
মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে সেদিন জন্ম নেয় বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত দুটি মুহূর্ত। প্রথমে দিয়েগো ম্যারাডোনা হাত দিয়ে বল জালে পাঠিয়ে করেন বিতর্কিত গোল, যা পরবর্তীতে 'হ্যান্ড অব গড' নামে পরিচিতি পায়। ম্যাচ শেষে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, 'এটি ছিল একটু ম্যারাডোনার মাথা, আর একটু ঈশ্বরের হাত।'
ইংল্যান্ডের কাছে এটি ছিল প্রতারণা, আর আর্জেন্টিনার অনেকের কাছে ছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতীকী প্রতিশোধ। পরে ম্যারাডোনা নিজেও স্বীকার করেছিলেন, যুদ্ধের প্রেক্ষাপট সেই গোলকে তাঁর কাছে ভিন্ন অর্থ দিয়েছিল।
এর মাত্র পাঁচ মিনিট পর নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে পাঁচজন ইংলিশ ফুটবলারকে কাটিয়ে করেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল। পরবর্তীতে ফিফা এটিকে 'গোল অব দ্য সেঞ্চুরি' হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। একই ম্যাচে ফুটবলের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং সবচেয়ে নান্দনিক গোলের জন্ম দেন একই ফুটবলার, যা এখনও বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি।
ম্যারাডোনা পরে বলেছিলেন, 'যদিও আমরা ম্যাচের আগে বলেছিলাম যে এর সঙ্গে যুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু আমরা জানতাম সেখানে অনেক আর্জেন্টাইন তরুণ মারা গেছে। এই জয়টি ছিল এক ধরনের প্রতীকী প্রতিশোধ।' তাঁর ভাষায়, এটি ছিল শুধু একটি ফুটবল দলকে নয়, বরং একটি দেশকে হারানোর অনুভূতি।
তবে এই বৈরিতার সূচনা ১৯৮৬ সালে নয়। আরও দুই দশক আগে, ১৯৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালেই দুই দেশের সম্পর্কে তিক্ততার শুরু। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিন বিতর্কিত লাল কার্ড দেখার পর মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ড কোচ আলফ রামসে আর্জেন্টাইনদের 'জানোয়ার' বলে মন্তব্য করলে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়।
১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে আবারও নাটকীয়তার জন্ম দেয় এই দ্বৈরথ। ডিয়েগো সিমিওনের সঙ্গে সংঘর্ষে মাঠে শুয়ে থেকেই পা বাড়িয়ে দেন ডেভিড বেকহ্যাম। সিমিওনে পড়ে গেলে বেকহ্যামকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান রেফারি। ২-২ সমতায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে, যেখানে জয় পায় আর্জেন্টিনা। দেশে ফিরে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন বেকহ্যাম। তাঁকে জাতীয় খলনায়কে পরিণত করেছিল ইংলিশ সংবাদমাধ্যম। পরে সিমিওনে স্বীকার করেছিলেন, ঘটনাটিকে তিনি আরও নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করেছিলেন।
তবে চার বছর পর ২০০২ বিশ্বকাপে নিজের জবাব দেন বেকহ্যাম। গ্রুপ পর্বের ম্যাচে তাঁর নেওয়া পেনাল্টির একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পায় ইংল্যান্ড। ১৯৯৮ সালের দুঃসহ স্মৃতি মুছে তিনি হয়ে ওঠেন ইংল্যান্ডের প্রতিশোধের নায়ক।
এরপর দীর্ঘ ২৪ বছর বিশ্বকাপে আর দেখা হয়নি দুই দলের। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটছে ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। এবার একদিকে আছেন বর্তমান বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক লিওনেল মেসি, অন্যদিকে জুড বেলিংহ্যাম ও হ্যারি কেইনের নেতৃত্বে ইংল্যান্ড।
দুই দলের কোচই অতীত ভুলে বর্তমানের ম্যাচে মনোযোগ দেওয়ার কথা বলেছেন। আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি এবং মেসি স্পষ্ট করেছেন, তারা ইতিহাস নয়, মাঠের ফুটবল নিয়েই ভাবছেন। কিন্তু আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের মতো ম্যাচে অতীতকে পুরোপুরি আলাদা করা কি আদৌ সম্ভব?
সম্ভবত নয়। কারণ এই দ্বৈরথে প্রতিপক্ষ শুধু ১১ জন ফুটবলার নন, প্রতিপক্ষ ইতিহাসও। ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি, ম্যারাডোনার 'হ্যান্ড অব গড', 'গোল অব দ্য সেঞ্চুরি', বেকহ্যামের লাল কার্ড এবং তাঁর প্রতিশোধের গোল, সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড আসলে এক জীবন্ত ইতিহাসের নাম।
২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে হয়তো লেখা হবে আরেকটি নতুন অধ্যায়। কিন্তু ফল যাই হোক, একটি বিষয় নিশ্চিত, আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড মানেই ফুটবলের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এটি স্মৃতির সঙ্গে বর্তমানের, কিংবদন্তির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের এবং ইতিহাসের সঙ্গে ভবিষ্যতের এক অনন্য লড়াই।