প্রকাশিত: ১৫ জুলাই ২০২৬ , ১০:১৭ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদর দপ্তর ব্রাসেলসে আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান প্রশাসনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাম্প্রতিক এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও ইইউর এই উদ্যোগকে আফগানিস্তান প্রশ্নে পশ্চিমা বিশ্বের কৌশলগত অবস্থানের পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
গত ২৩ জুন অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ইইউভুক্ত ২৭ দেশের মধ্যে ১৫ দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আফগানিস্তানের বর্তমান প্রশাসন একে 'ঐতিহাসিক' বৈঠক হিসেবে উল্লেখ করেছে। আলোচনায় আফগান নাগরিকদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন, কনস্যুলার সেবা পুনরায় চালু এবং ইউরোপে অবস্থানরত আফগান নাগরিকদের বিষয়ে বিভিন্ন বাস্তবিক বিষয় গুরুত্ব পায়।
২০২১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর প্রত্যাহারের পর তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা গ্রহণ করে। এরপর থেকে নারী শিক্ষা, নাগরিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তারা দীর্ঘদিন কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে রয়েছে। এখন পর্যন্ত ইইউর কোনো সদস্য রাষ্ট্র তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি।
তবে ব্রাসেলসের এই বৈঠককে সেই বিচ্ছিন্নতার মধ্যে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও তালেবান প্রতিনিধিদের দেওয়া ভিসার মেয়াদ ছিল মাত্র ২৪ ঘণ্টা এবং তা কেবল বৈঠকে অংশগ্রহণের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল।
বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রিভো বলেছেন, ইইউর অনুরোধেই তালেবান প্রতিনিধিদের ভিসা দেওয়া হয়েছে। এই বৈঠক কোনোভাবেই তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার সমার্থক নয়।
ইউরোপীয় কমিশনের মুখপাত্র মার্কাস ল্যামার্টও একই অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, আফগান নাগরিকদের প্রত্যাবর্তনসহ কয়েকটি বাস্তবিক বিষয়ে আলোচনা করতেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। এটিকে তালেবানকে রাজনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে বেলজিয়ামের অভিবাসনমন্ত্রী অ্যানলিন ভ্যান বসুইট বলেছেন, অভিবাসন ও নিরাপত্তা ইস্যুতে ইউরোপের জন্য আর স্থবির থাকার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে যৌথ ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপে কনস্যুলার কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে এই বৈঠককে কাজে লাগিয়েছে তালেবান। ইইউভিত্তিক গণমাধ্যম ইউরোঅ্যাকটিভ জানিয়েছে, ইউরোপজুড়ে আফগান নাগরিকদের জন্য কনস্যুলার সেবা পুনরায় চালুর বিষয়ে ইইউ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছে তালেবান প্রতিনিধিরা।
তালেবান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আবদুল কাহার বলখি জানিয়েছেন, বিদেশে বসবাসরত আফগান নাগরিকদের কনস্যুলার অধিকার নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ইউরোপীয় কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউরোপে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া আফগান নাগরিকদের শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি প্রদান এবং তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
সুইডেনের অভিবাসনমন্ত্রী ইয়োহান ফরসেল বলেন, সুইডেনে আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত এমন প্রায় ২০০ আফগান নাগরিক নির্বাসনের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আফগান নাগরিক বসবাস করছেন। জার্মানিতে প্রায় সাড়ে চার লাখ, অস্ট্রিয়ায় প্রায় ৯০ হাজার, ফ্রান্স ও সুইডেনে ৬০ থেকে ৭০ হাজার, নেদারল্যান্ডসে প্রায় ৬০ হাজার এবং যুক্তরাজ্যে প্রায় এক লাখ আফগান নাগরিক রয়েছেন। এছাড়া বেলজিয়াম, নরওয়ে, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড ও ইতালিতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আফগান নাগরিক বসবাস করছেন।
এই প্রেক্ষাপটে অপরাধে জড়িত ও আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত আফগান নাগরিকদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে তালেবানের সহযোগিতা চাইছে ইউরোপের কয়েকটি দেশ।
তবে ইইউর এই উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবাধিকার সংকটের জন্য দায়ী একটি শাসনব্যবস্থাকে কোনোভাবেই বৈধতা দেওয়া উচিত নয়। তালেবানের সঙ্গে যে কোনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আফগান নারী ও মেয়েদের অধিকার থাকতে হবে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গবেষক ফেরেশতা আব্বাসির মতে, তালেবানের সঙ্গে যেকোনো আলোচনায় মানবাধিকার ও জবাবদিহিতার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। আফগান নাগরিকদের এমন পরিস্থিতিতে ফেরত পাঠানো উচিত নয়, যেখানে তারা নিপীড়নের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
এদিকে ইউএনএইচসিআরের নীতি উন্নয়ন ও মূল্যায়ন বিভাগের সাবেক প্রধান এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং ফেলো জেফ ক্রিস্প সতর্ক করে বলেছেন, ইইউ থেকে ফেরত পাঠানো আফগান নাগরিকরা নিজ দেশে তালেবান শাসনের অধীনে নিপীড়নের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন।
সব মিলিয়ে, ব্রাসেলসের এই বৈঠক তালেবানকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পদক্ষেপ না হলেও আফগানিস্তানকে ঘিরে ইইউর বাস্তববাদী কূটনৈতিক অবস্থানের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। অভিবাসন, নিরাপত্তা ও মানবাধিকার ইস্যুর জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে তালেবান ও পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক কোন পথে এগোবে, তা এখন সময়ই বলে দেবে।