এখন সময় ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬ জুলাই ২০২৬ , ০৫:৩৯ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

ফ্রান্সের ২০২৭ নির্বাচন: অভিবাসন ইস্যুতে উত্তাপ হচ্ছে রাজনৈতিক লড়াই

ফ্রান্সের ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী এই রাষ্ট্রে আসন্ন নির্বাচন শুধু নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং অভিবাসন নীতি, অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা এবং সামাজিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন ফ্রান্সের আগামী কয়েক বছরের নীতিনির্ধারণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমান প্রেসিডেন্ট সংবিধান অনুযায়ী টানা দুই মেয়াদ পূর্ণ করায় ২০২৭ সালের নির্বাচনে আর প্রার্থী হতে পারবেন না। ফলে দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বে পরিবর্তন প্রায় নিশ্চিত। এই বাস্তবতায় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যে নিজেদের কৌশল পুনর্গঠন এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে প্রস্তুতি শুরু করেছে।

ফ্রান্সের নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রথম দফায় একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। কোনো প্রার্থী নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে সর্বাধিক ভোট পাওয়া দুই প্রার্থী দ্বিতীয় দফায় মুখোমুখি হন। সেই ভোটেই চূড়ান্তভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। বর্তমান সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের প্রথম দফার ভোট ১৮ এপ্রিল এবং দ্বিতীয় দফা ২ মে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা ঘোষণা হয়নি, তবুও সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা, জনমত জরিপ এবং কৌশলগত বিশ্লেষণ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।

এবারের নির্বাচনী বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে অভিবাসন ইস্যু। দীর্ঘদিন ধরেই ফ্রান্সে এটি একটি সংবেদনশীল রাজনৈতিক বিষয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপজুড়ে অভিবাসন প্রবাহ বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক চাপ এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সরকার ইতোমধ্যে অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। ভিসা আবেদন যাচাই আরও কঠোর করা, আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়ায় কড়াকড়ি আরোপ এবং অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব পদক্ষেপ প্রশাসনিক প্রয়োজনের পাশাপাশি জনমত ও রাজনৈতিক চাপেরও প্রতিফলন।

এ পরিস্থিতিতে ডানপন্থি দল অভিবাসনকে তাদের প্রধান নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে সামনে এনেছে। দলটি নতুন অভিবাসন কমানো, পরিবার পুনর্মিলনের শর্ত কঠোর করা, নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও কঠিন করা এবং অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের দাবি, রাষ্ট্রের সামাজিক ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক চাপ নিয়ন্ত্রণে এসব পদক্ষেপ প্রয়োজন।

অন্যদিকে মধ্যপন্থি রাজনৈতিক শক্তিগুলো বৈধ ও দক্ষ কর্মী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এবং প্রয়োজনীয় শ্রমশক্তির জন্য ফ্রান্সের দরজা খোলা রাখার পক্ষে মত দিচ্ছে। তবে তারা অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণেও কঠোর অবস্থানের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করছে। বামপন্থি দলগুলো অভিবাসনকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে অভিবাসীদের সামাজিক সুরক্ষা ও শ্রম অধিকারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

ডানপন্থি শিবিরে নেতৃত্ব নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। দলটির প্রভাবশালী নেতা বর্তমানে একটি আইনি আপিলের রায়ের অপেক্ষায় রয়েছেন। ওই রায়ের ওপর নির্ভর করবে তিনি ২০২৭ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না। যদি আদালতের সিদ্ধান্ত তার বিপক্ষে যায়, তাহলে দলটির সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে -এর নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ডানপন্থি শিবিরের নেতৃত্ব নিয়ে এই অনিশ্চয়তা নির্বাচনী সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। প্রার্থীদের চূড়ান্ত মনোনয়ন এবং দলগুলোর নির্বাচনী কৌশল স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা কঠিন হবে।

এদিকে ফ্রান্সে বসবাসরত অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যেও নির্বাচন ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে রেসিডেন্স পারমিট, নাগরিকত্ব, পরিবার পুনর্মিলন এবং কর্মসংস্থানসংক্রান্ত নীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমানে কার্যকর অভিবাসন নীতিই বহাল রয়েছে এবং ভবিষ্যতে কোনো পরিবর্তন আনতে হলে তা আইন প্রণয়ন, সংসদীয় অনুমোদন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বাস্তবায়ন করা হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ফ্রান্সে শুধু ক্ষমতার পালাবদলের লড়াই নয়, বরং দেশটির ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। আর সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অভিবাসন প্রশ্ন, যা আগামী দিনের রাজনৈতিক বিতর্ক ও জনমত গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।