ঢাকা অফিস

প্রকাশিত: ২৮ জুলাই ২০২৬ , ০৬:২৯ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

গুমের দায়ে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে নতুন আইন আনছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশে জোরপূর্বক গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রতিরোধ এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকার নতুন একটি আইনের খসড়া প্রকাশ করেছে। ‘গুম নিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৬’ নামে প্রস্তাবিত এই আইনটি কার্যকর হলে গুমের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার নতুন আইনি কাঠামো তৈরি হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জনমত ও অংশীজনদের মতামত গ্রহণের জন্য আইনের খসড়াটি প্রকাশ করেছে। প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি গুম হওয়ার পর তার মৃত্যু নিশ্চিত হলে কিংবা পাঁচ বছরেও তার সন্ধান না মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া যাবে।

আইনের খসড়ায় গুমের সংজ্ঞা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য কাউকে আটক বা গ্রেপ্তারের পর তার অবস্থান অস্বীকার করলে কিংবা তার পরিণতি গোপন রাখলে তা গুম হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে পরিকল্পিত বা ব্যাপক আকারে সংঘটিত গুমের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনি কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হবে।

গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ন্যূনতম তিন বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, গুমের ফলে মৃত্যু ঘটলে বা দীর্ঘ সময় ধরে নিখোঁজ থাকার ঘটনায় সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তথাকথিত গোপন আটক কেন্দ্র বা ‘আয়নাঘর’-এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান। এ ধরনের অননুমোদিত আটক কেন্দ্র নির্মাণ, পরিচালনা বা ব্যবহারকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে গুমের প্রমাণ নষ্ট বা বিকৃত করার ক্ষেত্রেও পৃথক শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

খসড়া আইনে ‘কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’ নীতিকে অন্তর্ভুক্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অধীনস্থ সদস্যদের গুমের নির্দেশ দিলে বা এ ধরনের অপরাধ সম্পর্কে জেনেও প্রতিরোধে ব্যবস্থা না নিলে তাকেও মূল অপরাধীর সমান শাস্তির আওতায় আনা হবে। জাতীয় নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক অস্থিরতার অজুহাতে গুমকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগও এই আইনে রাখা হয়নি।

বিচার প্রক্রিয়াকে দ্রুত সম্পন্ন করার লক্ষ্যে গুম সংক্রান্ত মামলার বিচার ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বিশেষ ক্ষেত্রে আরও ৩০ দিন বাড়ানো যেতে পারে। অপরাধ প্রমাণিত হলে ভুক্তভোগী বা তার পরিবারের জন্য দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

একই সঙ্গে আইনের অপব্যবহার ঠেকাতে মিথ্যা বা হয়রানিমূলক অভিযোগ দায়েরের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের তথ্য সংরক্ষণে একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার গঠনের প্রস্তাব রয়েছে, যা ভুক্তভোগী পরিবারের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

মানবাধিকার সুরক্ষা, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তাবিত আইনটি বাংলাদেশের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।