প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০২৬ , ০৮:০৮ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালিতে আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠী জামা’আত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল-মুসলিমিনের (জেএনআইএম) বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযান নিয়ে আলোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিকল্পনাটি অনুমোদিত হলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে যে দেশগুলোতে সামরিক অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন, মালি হবে সেই তালিকার অষ্টম দেশ। যদিও দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে ট্রাম্প বিশ্বব্যাপী সংঘাত কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ দেশের জনগণের কল্যাণে ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
তবে মালিতে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রশ্নে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেই মতভেদ রয়েছে। সামরিক অভিযানের অন্যতম সমর্থক হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন মার্কিন ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সন্ত্রাসবাদবিরোধী কার্যক্রমবিষয়ক সিনিয়র পরিচালক সেবাস্টিয়ান গোরকা। অন্যদিকে, কিছু কর্মকর্তা মনে করছেন, সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমাধানের পথ অনুসরণ করা উচিত।
জেএনআইএম বর্তমানে সাহেল অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর একটি। সংগঠনটি মালিতে শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলার পাশাপাশি বুরকিনা ফাসো, নাইজারসহ পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন উপকূলীয় দেশে হামলার পরিধি বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা রাজধানী বামাকোসহ মালির বিভিন্ন এলাকায় সমন্বিত হামলা চালিয়েছে এবং দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাহেল অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ এখন একটি বহুজাতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদার ও ন্যাটো মিত্রদের মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজারকে নিয়ে গঠিত অ্যালায়েন্স অব সাহেল স্টেটসকে জঙ্গিবিরোধী লড়াইয়ে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে।
তিন দেশেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়েছে। এরপর তারা পশ্চিমা দেশগুলোর পরিবর্তে নিরাপত্তা সহযোগিতার জন্য রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, রাশিয়া মালিতে কার্যকর নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে ব্যর্থ হয়েছে এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি।
প্রায় আড়াই কোটি মানুষের দেশ মালি দীর্ঘদিন ধরেই ইসলামপন্থী জঙ্গিগোষ্ঠীর সহিংসতায় অস্থির। দেশটির সামরিক জান্তা সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রথমে রুশ ভাড়াটে বাহিনী ওয়াগনার গ্রুপ এবং পরে আফ্রিকা কর্পসের সহায়তা নেয়। কিন্তু এরপরও জেএনআইএম ও ইসলামিক স্টেট-সংশ্লিষ্ট আইএস সাহেল নিজেদের প্রভাব বিস্তার অব্যাহত রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক অভিযান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর মালির সেনাবাহিনী ও তাদের রুশ মিত্রদের অভিযানে ৯২৫ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। একই সময়ে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর হামলায় নিহত হয়েছেন ২৩২ জন।
সাহেল অঞ্চলের বিশেষজ্ঞ ওয়াসিম নাসর মনে করেন, জেএনআইএমের বিরুদ্ধে আরও একটি সামরিক অভিযান সমস্যার সমাধান করবে না। তাঁর মতে, মালির সামরিক সরকারকে জঙ্গিগোষ্ঠীটির সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনায় বসার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। কারণ, সংগঠনটির লক্ষ্য আন্তর্জাতিক জিহাদ প্রতিষ্ঠার চেয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ইসলামী আইন প্রয়োগে বেশি কেন্দ্রীভূত।
তিনি বলেন, ফ্রান্স এক দশক ধরে এবং রাশিয়া পাঁচ বছর ধরে সামরিক সমাধানের চেষ্টা করেছে। কিন্তু এতে পরিস্থিতির উন্নতির পরিবর্তে আরও অবনতি হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে ফ্রান্স মালির তৎকালীন সরকারের অনুরোধে দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে। পরবর্তীতে অপারেশন বারখানের মাধ্যমে কয়েকজন শীর্ষ জঙ্গি নেতা নিহত হলেও সাহেল অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিস্তার পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, মালিতে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক অভিযানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বন্দি মার্কিন খ্রিস্টান মিশনারি কেভিন রাইডআউটকে উদ্ধারের প্রচেষ্টা। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি বর্তমানে মালিতেই বন্দি রয়েছেন। তাঁকে উদ্ধারের লক্ষ্যে মালির আকাশসীমায় মার্কিন নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নিয়েও ওয়াশিংটন আগ্রহ দেখিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সরাসরি সামরিক অভিযান চালায়, তাহলে জেএনআইএম প্রথমবারের মতো মার্কিন স্বার্থ ও নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে। একই সঙ্গে সংগঠনটি মূল আল-কায়েদা নেতৃত্বের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার পথেও হাঁটতে পারে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন দুটি পথ খোলা রয়েছে। একটি হলো সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে দমন করার চেষ্টা, অন্যটি রাজনৈতিক সংলাপ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ খোঁজা। মালিতে যুক্তরাষ্ট্র কোন পথ বেছে নেয়, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজরে রয়েছে।