ঢাকা অফিস

প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০২৬ , ০৮:২৪ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট শিল্পায়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিচ্ছে সরকার

বাংলাদেশের শিল্প খাত বর্তমানে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ সংকটের কারণে উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে রয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি সক্ষমতায় প্রভাব এবং নতুন বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা এখন দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।

রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক নীতি সংলাপে শিল্পপতি, ব্যাংকার, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং সরকারি কর্মকর্তারা দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করেন।

ব্যবসায়িক নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে শিল্পায়নের গতি ধরে রাখা কঠিন হবে। তাদের মতে, জ্বালানি নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও পূর্বাভাসযোগ্যতা বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য অপরিহার্য।

শিল্প উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং ভোল্টেজের ওঠানামার কারণে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে সামান্য বিদ্যুৎ বিপর্যয়ও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ব্যাংকিং খাতও এ সংকটের প্রভাব অনুভব করছে। গ্যাস সংযোগের অনিশ্চয়তায় বহু শিল্প প্রকল্পের বিনিয়োগ আটকে রয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর বিপুল পরিমাণ ঋণ ঝুঁকির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নীতিনির্ধারক এবং বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গত দুই দশকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ায় বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। বর্তমানে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে, যা শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ সংকটকে আরও তীব্র করেছে।

পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ১০০টি নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অনশোর ও অফশোর উভয় ক্ষেত্রেই অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর আগ্রহও দেখা যাচ্ছে।

সরকারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ বিতরণ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা হতে পারে। সরকারের মতে, এতে সেবার মান ও জবাবদিহি বাড়বে এবং বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার দক্ষতা উন্নত হবে। একই সঙ্গে সরকার উৎপাদন ও পাইকারি বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্ব নিজের হাতে রাখবে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্তমান সরকারের মেয়াদে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ক্লাস্টারভিত্তিক রুফটপ সোলার প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সৌর প্রযুক্তিতে কর-সুবিধা দেওয়ার বিষয়েও কাজ চলছে। বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের দরপত্র শিগগিরই আহ্বান করা হতে পারে।

অন্যদিকে, সম্প্রতি দেশের একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গ্যাস সরবরাহে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় শিল্প প্রতিষ্ঠান, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক গ্রাহকেরা ভোগান্তিতে পড়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা থেকে ধীরে ধীরে দেশীয় সম্পদনির্ভর ও বহুমুখী জ্বালানি ব্যবস্থায় রূপান্তর ঘটানো। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে নতুন গতি আসতে পারে।