প্রকাশিত: ২০ আগষ্ট ২০২৬ , ১২:১২ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজে লিপিযুক্ত একটি প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, মূর্তিটি প্রায় এক হাজার বছরের পুরোনো এবং ১০৪০ খ্রিস্টাব্দের, অর্থাৎ পাল সাম্রাজ্যের শেষ পর্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি নিদর্শন।
নতুন এই আবিষ্কার মহাস্থানগড়ের প্রাচীন ইতিহাস, পাল আমলের শিল্পকলা এবং সে সময়কার ধর্মীয় ও সামাজিক জীবন সম্পর্কে গবেষণায় নতুন তথ্য যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে মূর্তির গায়ে থাকা লিপি গবেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, ওই লিপি বিশ্লেষণ করে তৎকালীন সমাজ, ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং লিপিচর্চা সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, নতুন আবিষ্কৃত বিষ্ণুমূর্তিটির সময়কাল নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা গেলে মহাস্থানগড়ের বিভিন্ন প্রত্নস্তরের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ কালানুক্রমিক যোগসূত্র তৈরি হবে। এটি পাল আমলের শেষ দিকের ভাস্কর্যশিল্প এবং লিপির বিকাশ বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষকদের ধারণা, মূর্তিটির শিল্পরীতি, গঠন এবং গায়ে থাকা লিপি সে সময়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করছে। এ কারণে আবিষ্কারটিকে শুধু একটি পুরোনো মূর্তি হিসেবে নয়, বরং বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাসের একটি মূল্যবান দলিল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
রাজশাহী প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমানের মতে, নতুন মূর্তিটি মহাস্থানগড়ের সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজনের পাশাপাশি পাল আমলের সূক্ষ্ম শিল্পকলা, ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সক্রিয় লিপিচর্চার প্রমাণ বহন করে।
মহাস্থানগড় কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
মহাস্থানগড় বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। প্রাচীনকালে এটি পুণ্ড্রনগর বা পুণ্ড্রবর্ধন নামে পরিচিত ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে এখানে বিভিন্ন সময়ের নগরব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা প্রাচীর, প্রশাসনিক স্থাপনা, মন্দির, কূপ, পুঁতি, মুদ্রা ও মৃৎশিল্পের নিদর্শন পাওয়া গেছে।
বিভিন্ন সময়ের খননে এখানে মৌর্য, শুঙ্গ, গুপ্ত ও পাল আমলের নিদর্শনও পাওয়া গেছে। ফলে মহাস্থানগড় শুধু একটি নির্দিষ্ট রাজবংশের ইতিহাস নয়; বরং বাংলার দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে।
এই প্রত্নস্থানে আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ইতিহাসও বেশ পুরোনো। ১৯২৮ সালে এখানে প্রথম বড় ধরনের খননকাজ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে খনন ও গবেষণা চালানো হয়েছে। বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের যৌথ উদ্যোগেও মহাস্থানগড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা হয়েছে।
প্রাচীন মূর্তির সঙ্গে যুক্ত লিপি সাধারণত কোনো নিদর্শনের সময়কাল, পৃষ্ঠপোষক, ধর্মীয় উদ্দেশ্য কিংবা সামাজিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। মহাস্থানগড়ে আবিষ্কৃত নতুন বিষ্ণুমূর্তির ক্ষেত্রেও লিপিটি গবেষকদের বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।
গবেষণার মাধ্যমে লিপিটির পূর্ণ পাঠোদ্ধার ও ব্যাখ্যা করা সম্ভব হলে মূর্তিটি কে নির্মাণ করেছিলেন, কার পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি হয়েছিল কিংবা কোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এর সম্পর্ক ছিল—এসব বিষয়ে নতুন তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে পাল আমলের শেষ পর্যায়ে বরেন্দ্র অঞ্চলে হিন্দু ধর্মীয় শিল্প ও পৃষ্ঠপোষকতার ধরন সম্পর্কেও নতুন ধারণা পাওয়া যেতে পারে। একজন গবেষকের মতে, সে সময় শুধু রাজদরবার নয়, সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তিরাও ধর্মীয় শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। নতুন মূর্তিটি সেই সামাজিক বাস্তবতারও একটি সম্ভাব্য প্রমাণ হতে পারে।
মহাস্থানগড় জাদুঘরে বর্তমানে আরও ছয়টি বিষ্ণুমূর্তি দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শিত হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন আকার ও ওজনের আরও কয়েকটি মূর্তি সংরক্ষণাগারে রাখা আছে। নতুন আবিষ্কৃত মূর্তিটি এসব নিদর্শনের সঙ্গে তুলনামূলক গবেষণার সুযোগ তৈরি করবে।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের আশা, নতুন আবিষ্কারটি নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা হলে পাল আমলের মহাস্থানগড়ের ধর্মীয় জীবন, শিল্পরীতি ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসবে।
প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র মহাস্থানগড়ে নতুন এই আবিষ্কার তাই শুধু প্রত্নতত্ত্বের জন্য নয়, দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ। ভবিষ্যতে আরও খননকাজের মাধ্যমে এমন আরও নিদর্শন বেরিয়ে আসতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।