এখন সময় ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ আগষ্ট ২০২৬ , ০৮:৫০ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপে তিন দিন, ৮৪ বছরের নারী জীবিত উদ্ধার

ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেসে ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর বাঁশের ঘরের ধ্বংসাবশেষের নিচে আটকে ছিলেন; প্রাণে বেঁচে গেলেন অলৌকিকভাবে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভয়াবহ ভূমিকম্পে চারপাশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ঘরবাড়ি ভেঙে পড়েছে, যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন খোলা আকাশের নিচে। এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপে ঘটেছে অবিশ্বাস্য এক ঘটনা। ৮৪ বছর বয়সী এক নারীকে ভূমিকম্পের তিন দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার করেছেন উদ্ধারকর্মীরা।

নারীটির নাম পাউলিনা পোবি। শনিবারের শক্তিশালী ভূমিকম্পে তার বাঁশের তৈরি বাড়িটি পুরোপুরি ধসে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে যান তিনি। তিন দিন ধরে সেখানেই ছিলেন। বয়সের কারণে এবং শারীরিকভাবে চলাচলে অক্ষম হওয়ায় নিজে থেকে বের হওয়ার কোনো সুযোগও ছিল না।

উদ্ধারের পর তাকে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তার শরীরে গুরুতর কোনো আঘাত পাওয়া যায়নি। তবে দীর্ঘ সময় খাবার ও পানি ছাড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকার কারণে তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন।

শনিবার ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলের ফ্লোরেস দ্বীপের কাছে ৭.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল অগভীর হওয়ায় এর কম্পন ব্যাপক এলাকায় অনুভূত হয়। এতে বহু ঘরবাড়ি ও সরকারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিভিন্ন এলাকায় ভূমিধস দেখা দেয়।

ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকাজে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় যোগাযোগব্যবস্থা। অনেক রাস্তা ভূমিধসে বন্ধ হয়ে যায়। দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে কোথাও কোথাও উদ্ধারকর্মীদের পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগেছে।

পাউলিনা পোবির গ্রামেও একই ধরনের সমস্যা ছিল। ভূমিধসের কারণে উদ্ধারকারীদের সেখানে পৌঁছাতে দেরি হয়। অবশেষে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে তাকে জীবিত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া যায়।

এই উদ্ধারকে স্থানীয় উদ্ধারকর্মীরা আশার একটি বড় ঘটনা হিসেবে দেখছেন। কারণ ভূমিকম্পের কয়েক দিন পর সাধারণত ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা দ্রুত কমতে থাকে। সেই বাস্তবতার মধ্যে ৮৪ বছর বয়সী একজন নারীর বেঁচে থাকা উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে।

তবে ভূমিকম্পের সামগ্রিক চিত্র এখনো ভয়াবহ। সর্বশেষ প্রতিবেদনে মৃতের সংখ্যা ৭৩ জনে পৌঁছেছে, আহত হয়েছেন ৯০০-এর বেশি মানুষ এবং প্রায় ৬০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম এখনো চলছে। দুর্গম এলাকায় খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে সব এলাকায় সমানভাবে সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

এর মধ্যে ভূমিকম্পের পর ৩ হাজারের বেশি পরাঘাত রেকর্ড করা হয়েছে। ফলে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা, নতুন করে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে।

ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থিত। এখানে একাধিক টেকটোনিক প্লেটের সক্রিয়তার কারণে নিয়মিত ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে।

ফ্লোরেসের এই দুর্যোগ আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় শুধু উদ্ধারব্যবস্থা শক্তিশালী করাই যথেষ্ট নয়—ভূমিকম্প সহনশীল ভবন, দ্রুত সতর্কবার্তা, দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ এবং জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আর পাউলিনা পোবির তিন দিনের বেঁচে থাকার গল্পটি সেই ভয়াবহতার মধ্যেও একটি বার্তা দিয়েছে—ধ্বংসস্তূপের নিচেও কখনো কখনো জীবন অপেক্ষা করে।