প্রকাশিত: ১৩ আগষ্ট ২০২৬ , ০২:২৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
একসময় বিয়ের অপরিহার্য অনুষঙ্গ ছিল স্বর্ণের গয়না, এখন উচ্চমূল্যে অনেক পরিবার ভাবছে বিকল্প নিয়ে
একটি বাঙালি বিয়ে কল্পনা করলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে শাড়ি, মেহেদি, আলতা, কনের সাজ আর ঝলমলে স্বর্ণের গয়না। বিয়ের দিন কনের গলায় হার, কানে ঝুমকা, হাতে চুড়ি কিংবা মাথায় টিকলি—এসব যেন শুধু সাজের অংশ নয়, বরং বহুদিনের সামাজিক ও পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রতীক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ঐতিহ্যের হিসাব বদলে যাচ্ছে। বিশেষ করে স্বর্ণের দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকায় মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে বিয়ের গয়না এখন আনন্দের পাশাপাশি বড় আর্থিক চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একসময় একটি মেয়ের বিয়েতে কয়েক ভরি স্বর্ণ দেওয়া অনেক পরিবারের কাছেই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী কেউ বেশি, কেউ কম গয়না কিনলেও বিয়ের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে স্বর্ণের জন্য আলাদা বাজেট রাখা হতো। আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকেও স্বর্ণের গয়না উপহার দেওয়ার প্রচলন ছিল। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।
স্বর্ণের বর্তমান বাজারদর সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় অনেক পরিবারকে বিয়ের বাজেট নতুন করে সাজাতে হচ্ছে। যে অর্থ দিয়ে আগে কয়েক ভরি গয়না কেনা সম্ভব ছিল, এখন একই অর্থে তুলনামূলক কম গয়না পাওয়া যাচ্ছে। ফলে অনেক পরিবার বিয়ের কয়েক মাস আগে থেকেই স্বর্ণের দাম ও বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। বিয়েতে হল ভাড়া, খাবার, পোশাক, সাজসজ্জা, ছবি ও ভিডিও, অতিথি আপ্যায়নসহ নানা খাতে ব্যয় হয়। এর সঙ্গে স্বর্ণের গয়নার খরচ যোগ হলে মোট বাজেট অনেক বেড়ে যায়। ফলে অনেক পরিবার এখন গয়নার পরিমাণ কমিয়ে আনছে।
কনের পরিবারে এর প্রভাব যেমন রয়েছে, তেমনি বরপক্ষের ওপরও সামাজিক প্রত্যাশার চাপ রয়েছে। আগে যেখানে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে কয়েকটি স্বর্ণের গয়না পাওয়াকে স্বাভাবিক মনে করা হতো, এখন অনেক পরিবার নগদ অর্থ, পোশাক বা প্রয়োজনীয় সামগ্রীকে বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছে।
ঐতিহ্য আছে, বদলেছে হিসাব
বাংলার বিয়েতে স্বর্ণের ব্যবহার শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আবেগ, পারিবারিক স্মৃতি ও সামাজিক মর্যাদা। মায়ের বিয়ের হার মেয়ের বিয়েতে পরিয়ে দেওয়া, দাদির পুরোনো কানের দুল নাতনির জন্য রেখে দেওয়া কিংবা পরিবারের পুরোনো গয়না নতুন নকশায় তৈরি করা—এসব রীতিও বহু পরিবারের কাছে বিশেষ অর্থ বহন করে।
উচ্চমূল্যের কারণে পুরোনো স্বর্ণের গয়না নতুন করে ব্যবহার করার প্রবণতাও বাড়ছে। অনেক পরিবার নতুন করে বেশি গয়না না কিনে পুরোনো গয়না মেরামত করে বা গলিয়ে নতুন নকশায় তৈরি করছে। এতে খরচ কিছুটা কমানো সম্ভব হচ্ছে।
গয়নার নকশাতেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ভারী হার বা বড় সেটের বদলে অনেকে এখন হালকা ও ব্যবহারযোগ্য গয়না বেছে নিচ্ছেন। এমন গয়না, যা শুধু বিয়ের দিন নয়, পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যবহার করা যায়—সেদিকেই আগ্রহ বাড়ছে।
বদলে যাচ্ছে কনের সাজ
বিয়ের সাজেও এসেছে নতুনত্ব। স্বর্ণের গয়নার পাশাপাশি কৃত্রিম অলংকার, রুপার গয়না, মুক্তা, পাথর ও বিভিন্ন ধরনের নকশার গয়না ব্যবহার করছেন অনেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন নতুন বিয়ের সাজের জনপ্রিয়তাও এই পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে।
তবে পুরোপুরি স্বর্ণকে বাদ দেওয়ার প্রবণতা এখনো ব্যাপক নয়। বরং অনেক পরিবার কম পরিমাণে হলেও আসল স্বর্ণ রাখার চেষ্টা করছে। একটি ছোট হার, কানের দুল কিংবা আংটির মতো প্রয়োজনীয় কয়েকটি গয়না দিয়ে ঐতিহ্যটুকু ধরে রাখার চেষ্টা চলছে।
অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে, স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি শুধু বিয়ের বাজারে নয়, সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলছে। অনেকে প্রয়োজনের সময় বিক্রি করা যাবে—এই চিন্তা থেকে স্বর্ণকে সম্পদ হিসেবে দেখেন। ফলে স্বর্ণের দাম বাড়লেও এর চাহিদা পুরোপুরি কমে যাচ্ছে না।
ঐতিহ্য থাকবে, বদলাবে তার রূপ
বাঙালির বিয়ের ঐতিহ্য হয়তো স্বর্ণের গয়না ছাড়া পুরোপুরি কল্পনা করা কঠিন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ঐতিহ্যের রূপ বদলায়। একসময় যে বিয়েতে কনের গায়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত স্বর্ণ থাকত, ভবিষ্যতে হয়তো সেখানে থাকবে সীমিত কিন্তু অর্থবহ কিছু গয়না।
কারণ বিয়ের আসল সৌন্দর্য কেবল গয়নার ভারে নয়—দুই পরিবারের মিলন, প্রিয়জনদের উপস্থিতি এবং নতুন জীবনের শুরুতেই এর সবচেয়ে বড় আনন্দ। স্বর্ণের দাম যতই বাড়ুক, বাঙালির বিয়ের সেই আবেগ হারিয়ে যাওয়ার নয়। বরং অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তার প্রকাশভঙ্গিই হয়তো বদলে যাবে।