এখন সময় ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বার ২০২৬ , ০৮:৪৮ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

গণতন্ত্র, রোহিঙ্গা ও জলবায়ু প্রশ্ন সামনে আনলেন তারেক রহমান

বিশ্বমঞ্চে প্রথম ভাষণে ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন’ কৌশল তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী, গুতেরেসের সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ও বাংলাদেশ-জাতিসংঘ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা, নিউইয়র্কে বিশ্বরাজনীতির উত্তাপও তুঙ্গে

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভাষণকে ঘিরে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। নিউইয়র্কে দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর মধ্যে ছিল প্রধানমন্ত্রীর সাধারণ পরিষদে ভাষণ, জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে বৈঠক, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও জলবায়ু অর্থায়নের প্রশ্ন সামনে আনা এবং কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। 

সাধারণ পরিষদের ভাষণে তারেক রহমান বাংলাদেশের জন্য ‘থ্রি আর’ বা Recovery, Restoration and Reconstruction কৌশলের কথা তুলে ধরেন। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এর লক্ষ্য দেশের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধার, সংস্কার এবং পুনর্গঠন। তিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বাংলাদেশকে উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা, তরুণ উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবকদের সহায়তা এবং নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও বলেন। পূর্ববর্তী দেড় দশকের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি কঠোর রাজনৈতিক সমালোচনা করেন, যা তার সরকারের নিজস্ব মূল্যায়ন হিসেবে ভাষণে উপস্থাপিত হয়েছে। 

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে তার দল সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করেন। 

তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসেবে আবারও সামনে এসেছে রোহিঙ্গা সংকট। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নয় বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ১২ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে এবং এর ফলে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তার বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করেন, সংকটের উৎস মিয়ানমারে এবং এর স্থায়ী সমাধানও সেখানে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনকেই তিনি মূল সমাধান হিসেবে তুলে ধরেন এবং জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর সহযোগিতা চান। 

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে বৈঠকেও রোহিঙ্গা সংকট অগ্রাধিকার পায়। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রা, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং বাংলাদেশ-জাতিসংঘ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। উভয় পক্ষ দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা আরও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মত প্রকাশ করে। 

জলবায়ু প্রশ্নেও ঢাকা এবার জোরালো অবস্থান তুলে ধরেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে সামান্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির অন্যতম বড় শিকার দেশটি। এ কারণে জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তায় উন্নত বিশ্বের আরও সক্রিয় ভূমিকা চেয়েছেন তিনি। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সদস্য ড. সাইমুম পারভেজও

জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ফোরাম এর বৈঠকে জলবায়ু ন্যায়বিচার ও ন্যায্য অর্থায়নের দাবি তুলে ধরেছেন। 

ফিলিস্তিন প্রশ্নেও বাংলাদেশের চলমান অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি বাংলাদেশের সমর্থনের কথা বলেন। একই সঙ্গে যুদ্ধ ও সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির আহ্বান জানান। 

নিউইয়র্কে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক, আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং জাতিসংঘসহ বহুপক্ষীয় ফোরামে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, উভয় নেতা সাম্প্রতিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গতিকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং সহযোগিতা আরও বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। 

এদিকে এবারের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন বিশ্বব্যবস্থা একাধিক যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জলবায়ু সংকট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণ এবং জাতিসংঘের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। মেয়াদের শেষ সাধারণ পরিষদ ভাষণে গুতেরেস বিশ্বনেতাদের যুদ্ধ বন্ধ, জলবায়ু মোকাবিলা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ এবং জাতিসংঘ ব্যবস্থার সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রায় ১৩০ জন বিশ্বনেতা এবারের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে নিউইয়র্কে সমবেত হয়েছেন। 

বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় বহু প্রতিনিধি সাধারণ পরিষদের কক্ষ ত্যাগ করেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ছবিতে বাংলাদেশের আসনও এক পর্যায়ে খালি দেখা গেছে, যদিও কোন কোন দেশের পুরো প্রতিনিধিদল আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়াকআউট করেছে তার পূর্ণাঙ্গ নিশ্চিত তালিকা প্রকাশিত হয়নি। ফলে এ বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। 

সব মিলিয়ে ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘে ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সাধারণ পরিষদ ভাষণ থেকে শুরু করে রোহিঙ্গা, জলবায়ু, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা এবং দ্বিপক্ষীয় বৈঠক পর্যন্ত ঢাকা তার নতুন সরকারের আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারগুলো স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছে। এখন নজর থাকবে, নিউইয়র্কে বাকি বৈঠকগুলো থেকে কোনো বাস্তব কূটনৈতিক অগ্রগতি বা নতুন প্রতিশ্রুতি আসে কি না।