প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বার ২০২৬ , ০৭:২৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
সংবর্ধনা নেবেন না প্রধানমন্ত্রী, তবুও থামছে না পক্ষে-বিপক্ষে উত্তেজনা
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নিউ ইয়র্ক আসছেন, জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগদান করতে। কিন্তু তাঁকে ঘিরে বহুল আলোচিত নাগরিক সংবর্ধনা হচ্ছে না। সরকারি অর্থে নয়, দলীয় কিংবা ব্যক্তিগত অর্থে বড় আয়োজনের প্রস্তাবেও তিনি আগ্রহ দেখাননি। সফরও আগের পরিকল্পনার তুলনায় অনেক সংক্ষিপ্ত হয়েছে। বাদ পড়েছে সান ফ্রান্সিসকো সফর।
তারপরও নিউইয়র্কের বাংলাদেশি মহল্লায় উত্তেজনা কমেনি। বরং কোথাও কোথাও যেন আরও বেড়েছে।
জ্যাকসন হাইটস, উডসাইডসহ বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকায় পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন, রেস্তোরাঁর টেবিলের রাজনৈতিক আলোচনা এবং সংগঠনের প্রস্তুতি দেখে মনে হতে পারে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অংশ কয়েক দিনের জন্য আটলান্টিক পেরিয়ে নিউইয়র্কে এসে অবস্থান নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছানোর কথা। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে তাঁর ভাষণ দেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে। সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী সফরটি প্রায় ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে সীমিত রাখা হয়েছে এবং ২৫ সেপ্টেম্বর রাতেই তাঁর নিউইয়র্ক ছাড়ার কথা। আগে যুক্তরাষ্ট্রে আরও দীর্ঘ অবস্থান এবং সান ফ্রান্সিসকো সফরের পরিকল্পনা ছিল।
এই সফরের সবচেয়ে লক্ষণীয় ঘটনাগুলোর একটি হলো নাগরিক সংবর্ধনা থেকে প্রধানমন্ত্রীর সরে থাকা।
নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেটের উদ্যোগে একটি সংবর্ধনার আলোচনা হয়েছিল। পরে দলীয় নেতা-কর্মীদের নিজস্ব অর্থায়নেও বড় অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তাব ওঠে। কিন্তু প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বড় ধরনের সংবর্ধনা নিতে আগ্রহী নন। সরকার যখন রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর নীতি অনুসরণ করছে, তখন নিজের সফরকে ঘিরে বড় ব্যয়কে তিনি তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করছেন না
এখানেই এবারের নিউইয়র্ক সফরের এক অভিনব রাজনৈতিক বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নিজে উৎসবের পরিধি ছোট করতে চাইছেন। অথচ তাঁর সমর্থকদের একাংশ তাঁকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। বিরোধীরা প্রতিবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির ভেতরের বিভিন্ন অংশের মধ্যেও আয়োজন, নেতৃত্ব এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতপার্থক্যের খবর স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
কোন পক্ষ সামনে থাকবে, কারা বিমানবন্দরে যাবে, কারা জাতিসংঘের সামনে অবস্থান নেবে, কে কোন কর্মসূচির নেতৃত্ব দেবে, এসব প্রশ্নও প্রবাসী রাজনীতির আলোচনায় স্থান পাচ্ছে।
তবে এখানে তথ্যগত একটি পার্থক্য জরুরি। দলীয় অভ্যন্তরীণ বিরোধই প্রধানমন্ত্রীর সফর সংক্ষিপ্ত করার কারণ, এমন কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি ঘোষণা এখন পর্যন্ত নেই। স্থানীয় কিছু প্রতিবেদনে অর্থ সংগ্রহ, অনুষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ এবং নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা নিয়ে অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর সব স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। সরকারি ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর-সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যায় সফর সংক্ষিপ্ত করা এবং সান ফ্রান্সিসকো বাদ দেওয়ার কারণ হিসেবে রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানো ও সময় ব্যবস্থাপনার কথাই বলা হয়েছে। অর্থাৎ দুটি বাস্তবতা পাশাপাশি চলছে।
একদিকে প্রধানমন্ত্রী দৃশ্যত সংযমের বার্তা দিতে চাইছেন। অন্যদিকে প্রবাসের রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর প্রতিযোগিতা এবং আবেগ নিজেদের গতিতেই চলছে।
এবারের পরিস্থিতি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণেও ব্যতিক্রমী।
২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিবর্তনপর্ব শেষে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। এবারই তিনি নির্বাচিত সরকারপ্রধান হিসেবে প্রথম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অংশ নিচ্ছেন।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন বাংলাদেশের ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ এখন দেশের ভেতরে রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞার মুখে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী দলটির সমর্থকদের রাজনৈতিক মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সেই প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর নয়। ফলে তারা নিউইয়র্কে প্রতিবাদ কর্মসূচির প্রস্তুতি নিতে পারছে। স্থানীয় প্রতিবেদনে ২১ সেপ্টেম্বর জেএফকে বিমানবন্দর এবং ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে প্রতিবাদের ঘোষণার কথাও এসেছে।
অন্যদিকে বিএনপির নেতা-কর্মীরা বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা এবং জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বাইরে স্বাগত কর্মসূচি নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ফলে নিউইয়র্কে একই বাংলাদেশকে এবার দুই বিপরীত রাজনৈতিক অবস্থান থেকে দেখা যাবে।কিন্তু বড় প্রশ্নটি আরও গভীরে।
জাতিসংঘের সদস্য ১৯৩টি দেশের প্রতিনিধিরা নিউইয়র্কে আসেন। নিউইয়র্ক পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশের অভিবাসীর শহর। ভারতীয়, পাকিস্তানি, নেপালি, শ্রীলঙ্কান, আফ্রিকান, লাতিন আমেরিকান, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী এখানে রয়েছে। তাদের দেশেও নির্বাচন হয়, সরকার বদলায়, রাজনৈতিক বিরোধ থাকে।
তবু বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধানের জাতিসংঘ সফর ঘিরে জ্যাকসন হাইটস বা উডসাইডে যে মাত্রায় দলীয় উত্তেজনা, পোস্টার-ব্যানার, পাল্টাপাল্টি প্রস্তুতি এবং দৈনন্দিন সামাজিক জীবনের ভেতরে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়, সেটি বিশেষভাবে চোখে পড়ে।
অবশ্য অন্য দেশের প্রবাসীরা রাজনৈতিক প্রতিবাদ করেন না, এমন বলা যাবে না। ইরান, ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের রাজনীতি ঘিরে নিউইয়র্কে বড় বিক্ষোভ হয়েছে এবং এবারের জাতিসংঘ সপ্তাহেও আন্তর্জাতিক সংঘাতকে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রতিবাদের প্রস্তুতি রয়েছে।
বাংলাদেশি প্রবাসী রাজনীতির বিশেষত্ব অন্য জায়গায়। বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক বিভাজন থাকে, তার অনেকটাই প্রবাসেও হুবহু বহন করা হয়। মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হয়েছেন, ব্যবসা গড়েছেন, সন্তানরা আমেরিকায় বড় হচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশের দলীয় পরিচয় অনেকের সামাজিক পরিচয়েরও অংশ হয়ে আছে।
ফলে রেস্তোরাঁর একটি টেবিলও কখনো রাজনৈতিক মঞ্চ হয়ে ওঠে। কমিউনিটি সংগঠন বিভক্ত হয় দলীয় পরিচয়ে। সামাজিক অনুষ্ঠানেও রাজনৈতিক অবস্থান দৃশ্যমান হয়। আর দেশের কোনো বড় নেতা নিউইয়র্কে এলে সেই সুপ্ত প্রতিযোগিতা হঠাৎ প্রকাশ্য হয়ে ওঠে।
জাতিসংঘের অধিবেশন এই প্রবণতাকে আরও উসকে দেয়। কারণ জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে দাঁড়ানোর মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক প্রতীকি মূল্য আছে। কয়েকশ মানুষের একটি সমাবেশ বাস্তবে কোনো রাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তন না করলেও অংশগ্রহণকারীদের কাছে সেটি হয়ে ওঠে বিশ্বকে নিজের অবস্থান জানানোর সুযোগ।
প্রবাসী সংগঠনগুলোর আরেকটি বাস্তবতাও এর সঙ্গে যুক্ত। দেশের রাজনীতিতে সরাসরি অংশ নেওয়ার সুযোগ সীমিত হওয়ায় নেতার সফর, বিমানবন্দর অভ্যর্থনা, জাতিসংঘের সামনে সমাবেশ কিংবা নাগরিক সংবর্ধনা অনেক সময় সংগঠনের শক্তি প্রদর্শনের উপলক্ষ হয়ে ওঠে। কে কত লোক আনতে পারল, কে মঞ্চের কাছে থাকল, কার ব্যানার বড়, কার নেতৃত্ব স্বীকৃতি পেল, এসবও তখন রাজনৈতিক মর্যাদার অংশ হয়ে যায়।
সম্ভবত এখানেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের সিদ্ধান্তটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
তিনি বড় সংবর্ধনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। সফর সংক্ষিপ্ত করেছেন। সান ফ্রান্সিসকো সফর বাদ দিয়েছেন। সরকারি ব্যয় কমানোর কথা সামনে এসেছে। কিন্তু তাঁর সেই সংযমের সিদ্ধান্তও প্রবাসী রাজনীতির উত্তেজনা থামাতে পারেনি।
বরং একটি প্রশ্ন আরও স্পষ্ট হয়েছে: নেতা যদি সংবর্ধনা না চান, তারপরও এত সংবর্ধনার প্রতিযোগিতা কেন? নেতা যদি সফরকে রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক কর্মসূচিতে সীমিত রাখতে চান, তারপরও প্রবাসের রাজনৈতিক সংগঠনগুলো কেন এটিকে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের উপলক্ষ হিসেবে দেখে?
এ প্রশ্ন কেবল বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগের নয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের প্রবাসী রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্ন।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়তো জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট, উন্নয়ন, বহুপাক্ষিক সহযোগিতা এবং বিশ্বব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে কথা বলবেন। বিশ্বনেতারা শুনবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অবস্থান।
আর জাতিসংঘ ভবনের বাইরে, জ্যাকসন হাইটসের রাস্তায় এবং রেস্তোরাঁর টেবিলে চলবে আরেক বাংলাদেশ।
একটি বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে নিজের ভবিষ্যতের কথা বলবে। আরেকটি বাংলাদেশ পুরোনো রাজনৈতিক বিভাজন, নতুন ক্ষমতার সমীকরণ, দলীয় প্রতিযোগিতা এবং প্রবাসের পরিচয়-রাজনীতির সঙ্গে লড়বে।
এবারের জাতিসংঘ সপ্তাহে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গল্প সম্ভবত এখানেই, প্রধানমন্ত্রী সংবর্ধনা চান না, কিন্তু তাঁকে ঘিরে প্রবাসী রাজনীতি থামতে জানে না।