এখন সময় ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বার ২০২৬ , ০২:২২ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

জাতিসংঘে ব্যস্ত বাংলাদেশ, নিউইয়র্কে রাজনৈতিক উত্তাপ

আজ বাংলায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী, রোহিঙ্গা-জলবায়ু-জ্বালানি কূটনীতিতে তৎপর ঢাকা, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন ঘিরে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা এখন সবচেয়ে ব্যস্ত পর্যায়ে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ ভাষণ সামনে রেখে একদিকে চলছে একের পর এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, অন্যদিকে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও সফরটিকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা দৃশ্যমান হয়েছে। সমর্থকদের স্বাগত কর্মসূচির পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের প্রতিবাদও হয়েছে। সব মিলিয়ে এবারের জাতিসংঘ অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক মঞ্চ নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রতিধ্বনিও এসে পড়েছে নিউইয়র্কে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক সময় বিকেল প্রায় ৫টার দিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বাংলায় ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। এটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম জাতিসংঘ ভাষণ। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বক্তব্যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা, বিশ্বশান্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কার গুরুত্ব পাবে। 

প্রধানমন্ত্রী ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছান। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২৬ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আয়োজিত সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের স্বাগত প্রাতরাশে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর মূল জাতিসংঘ কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী সাধারণ বিতর্কে তিনি বাংলাদেশের আসনে যোগ দেন। একই দিন বিশ্বনেতাদের সম্মানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের আয়োজিত নৈশভোজেও প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান অংশ নেন। 

এবারের সফরে বাংলাদেশের সবচেয়ে জোরালো কূটনৈতিক বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে রোহিঙ্গা সংকট। জাতিসংঘ সদরদপ্তরে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী সংকট সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ, মিয়ানমারে বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তার ধারাবাহিকতা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা এবং মানবপাচার, মাদক ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা। 

জাতিসংঘ সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভবিষ্যৎ। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ, নৌপরিবহন, রেমিট্যান্স এবং পশ্চিম এশিয়ায় কর্মরত প্রায় ৮০ লাখ প্রবাসীর ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়টি উত্থাপন করেন। হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতিতে আটকে থাকা বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগও চলছে সমান্তরালভাবে। ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই প্লেনকোভিচের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে। বিশ্বব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্ব, ভুটান ও মালদ্বীপের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে বা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সরকারের ঘোষিত সূচিতে কুয়েত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, হাইতি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকের কথাও রয়েছে। 

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও বাংলাদেশ সক্রিয় অবস্থান নিচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অস্তিত্বগত ঝুঁকি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ক্ষয়ক্ষতি এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নে বাংলাদেশের দাবি তুলে ধরার প্রস্তুতির কথাও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। একই সঙ্গে মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং প্রশিক্ষিত ধাত্রীসেবা নিয়ে বাংলাদেশ আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের কর্মসূচি রয়েছে। 

তবে জাতিসংঘ সদরদপ্তরের কূটনৈতিক ব্যস্ততার বাইরে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি সমাজে দৃশ্যপটটি অনেক বেশি রাজনৈতিক। প্রধানমন্ত্রী আসার আগে থেকেই জ্যাকসন হাইটসসহ বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকায় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ব্যানার, মিছিল ও সমাবেশের মাধ্যমে তাঁকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নেয়। সংবাদমাধ্যমের হিসাবে, সফর ঘিরে নিউইয়র্কে বিএনপি ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো বহু প্রস্তুতি সভা করেছে। (BSS)

একই সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানও প্রকাশ পেয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর জ্যাকসন হাইটসের ডাইভার্সিটি প্লাজায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের পাল্টাপাল্টি অবস্থান একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কিতে গড়ালে নিউইয়র্ক পুলিশ দুই পক্ষকে আলাদা করে। ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এই ঘটনা দেখিয়েছে যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে নিউইয়র্কের প্রবাসী সমাজেও দৃশ্যমান।

এর মধ্যেই বাংলাদেশের ১১ দলীয় বিরোধী জোট এবং জামায়াতে ইসলামীর আলোচিত ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ নিয়ে নিউইয়র্কে আলাদা কোনো আনুষ্ঠানিক জাতিসংঘ কর্মসূচির খবর ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ২৪ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও যাচাইযোগ্য সূত্রে ১১ দলীয় জোটের ছায়া মন্ত্রিসভা নামে কোনো প্রতিনিধি দলের জাতিসংঘ অধিবেশনে আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ বা জাতিসংঘের ভেতরে নির্ধারিত কর্মসূচির নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে প্রবাসী কোনো দলীয় বা প্রতিবাদ কর্মসূচিকে জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ হিসেবে দেখানো সমীচীন হবে না।

অর্থাৎ নিউইয়র্কে এখন দুটি সমান্তরাল বাংলাদেশ দৃশ্যমান। জাতিসংঘের ভেতরে সরকার রোহিঙ্গা, জলবায়ু, জ্বালানি নিরাপত্তা, বিনিয়োগ ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার প্রশ্নে কূটনৈতিক অবস্থান তুলে ধরছে। বাইরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি অংশ নতুন সরকারকে স্বাগত জানাচ্ছে, অন্য অংশ প্রতিবাদে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ করছে।

আজ প্রধানমন্ত্রীর সাধারণ পরিষদের ভাষণের পরই পরিষ্কার হবে বাংলাদেশ তার আন্তর্জাতিক বার্তার কেন্দ্রবিন্দুতে কোন বিষয়গুলোকে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট, গণতান্ত্রিক রূপান্তর, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় বাংলাদেশের অর্থনীতি ও প্রবাসীদের নিরাপত্তা এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তাঁর বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে কতটা সাড়া ফেলে, সেটিই এখন নজরে থাকবে।