প্রকাশিত: ২৯ আগষ্ট ২০২৬ , ০৬:৩৬ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
ন্যাটোভুক্ত দেশে রুশ হামলার আশঙ্কা নিয়ে সতর্কবার্তার দাবি; ট্রাম্প বলছেন, পুতিন ন্যাটোকে আক্রমণ করবেন না
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: রাশিয়া ও পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) পরিচালক জন র্যাটক্লিফের গোপন মস্কো সফর ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন ও পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া যেন কোনো ন্যাটোভুক্ত দেশে সামরিক পদক্ষেপ না নেয়—এ বিষয়ে মস্কোকে সতর্ক করতেই এই সফর হয়ে থাকতে পারে। তবে ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে সফরের বিস্তারিত প্রকাশ করেনি।
রুশ গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান সের্গেই নারিশকিনও র্যাটক্লিফের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি এটিকে ‘কর্মপর্যায়ের’ বৈঠক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ক্রেমলিন জানিয়েছে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে বৈঠক সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছিল, তবে র্যাটক্লিফের সঙ্গে তাঁর সরাসরি সাক্ষাৎ হয়নি।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ র্যাটক্লিফের মস্কো সফর?
সিআইএ পরিচালকের মস্কো সফর অত্যন্ত বিরল ঘটনা। রাশিয়া–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক যখন ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান সংকট এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসে গভীর সংকটে রয়েছে, তখন মার্কিন গোয়েন্দাপ্রধানের সরাসরি মস্কো যাওয়া কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকে রাশিয়ার সম্ভাব্য সামরিক কর্মকাণ্ড এবং ইরানকে মস্কোর সমর্থনের বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ স্থবির হয়ে পড়ার মধ্যেই এই যোগাযোগ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সূত্রের দাবি, র্যাটক্লিফ রাশিয়াকে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আগ্রাসী পদক্ষেপ না নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। বিশেষ করে বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলো—এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়া—নিয়ে পশ্চিমা নিরাপত্তা মহলে উদ্বেগ রয়েছে।
ট্রাম্পের বক্তব্য ভিন্ন
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিস্থিতিকে তুলনামূলকভাবে শান্তভাবে দেখছেন। তিনি বলেছেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ন্যাটো ভূখণ্ডে হামলা করবেন না। র্যাটক্লিফের মস্কো সফরকেও ট্রাম্প ‘সেমি-রুটিন’ বৈঠক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এতে মার্কিন প্রশাসনের প্রকাশ্য অবস্থান এবং গোয়েন্দা পর্যায়ের উদ্বেগের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। একদিকে ট্রাম্প রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাত বাড়াতে চাইছেন না, অন্যদিকে মার্কিন গোয়েন্দা ও ইউরোপীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সম্ভাব্য রুশ পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করছেন।
বাল্টিক দেশগুলো কেন উদ্বিগ্ন?
এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়া ভৌগোলিকভাবে রাশিয়ার কাছাকাছি এবং তিনটিই ন্যাটোর সদস্য। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পর এসব দেশের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
তবে বাল্টিক দেশগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, র্যাটক্লিফের সফরের পরও তাদের তাৎক্ষণিক হুমকি মূল্যায়নে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। অর্থাৎ সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা রয়েছে, কিন্তু রাশিয়া এখনই ন্যাটোতে হামলা করতে যাচ্ছে—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য তারা প্রকাশ করেনি।
অন্যদিকে ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোতে রাশিয়ার কথিত ‘হাইব্রিড’ কর্মকাণ্ড নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বাল্টিক সাগর অঞ্চলের আট ন্যাটোভুক্ত দেশ যৌথ ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। ইউরোপীয় কর্মকর্তারা অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা ও সামরিক স্থাপনার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নাশকতার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
সরাসরি যুদ্ধের আশঙ্কা কতটা?
বর্তমানে রাশিয়া ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশে হামলা করতে যাচ্ছে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বক্তব্যে সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি রাশিয়া–পশ্চিমা সম্পর্কের অন্য ক্ষেত্রেও উত্তেজনা বাড়ছে। ইউক্রেনকে পশ্চিমা অস্ত্র সরবরাহ, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সামরিক ও রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়ছে।
এর মধ্যেই র্যাটক্লিফের মস্কো সফর একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে: ওয়াশিংটন প্রকাশ্যে উত্তেজনা কমানোর কথা বললেও, গোপন কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা যোগাযোগের মাধ্যমে সম্ভাব্য বড় সংকট ঠেকানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আগামী দিনগুলোতে রাশিয়া–ন্যাটো সীমান্তে কোনো নতুন সামরিক তৎপরতা দেখা যায় কি না এবং যুক্তরাষ্ট্র–রাশিয়ার গোপন যোগাযোগ আরও এগোয় কি না—সেদিকেই নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।