প্রকাশিত: ২৮ আগষ্ট ২০২৬ , ০৪:৫৭ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
সৌদি প্রস্তাব এলে বিবেচনার কথা সরকারের; আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন সমীকরণ
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে সরকার। সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানালে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলরা। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
মক্কায় চলতি মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান যে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে, তার মূল নীতি হলো—এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ চুক্তিটি অনেকটা সম্মিলিত প্রতিরক্ষা কাঠামোর আদলে তৈরি। তুরস্কের পক্ষ থেকেও ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোর জন্য চুক্তিটি উন্মুক্ত রাখার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার অবস্থান কী
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠলে বাংলাদেশ সেটিকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছে না। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ এলে ঢাকার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। দেশটিতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন এবং বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা প্রবাসী আয়। ফলে সৌদি নেতৃত্বাধীন কোনো আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে
মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো ভারতের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক। কারণ চুক্তির অন্যতম অংশীদার পাকিস্তান ভারতের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে বাংলাদেশ কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে যুক্ত হলে নয়াদিল্লির সঙ্গে কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
বর্তমানে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ। ঢাকার পক্ষ থেকে তাঁকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছে এবং ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি তারা পর্যালোচনা করছে। একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়টিও এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
শুধু সামরিক জোট নয়, অর্থনীতির হিসাবও আছে
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি কেবল নিরাপত্তা বা সামরিক সহযোগিতার প্রশ্ন নয়। দেশের রপ্তানি বাজার ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যনির্ভর; অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা অংশীদার। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গেও রয়েছে শ্রমবাজার ও জ্বালানি সম্পর্ক।
তাই কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব পড়বে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে মক্কা চুক্তির সদস্যপদ কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে—এটাই হবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত নয়
এ মুহূর্তে বাংলাদেশ মক্কা চুক্তিতে যোগ দিয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং আমন্ত্রণ এলে বিষয়টি বিবেচনার পর্যায়ে রয়েছে। তবে সরকারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে বিষয়টির প্রতি ইতিবাচক মনোভাব স্পষ্ট হওয়ায় আঞ্চলিক কূটনীতিতে এটি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আগামী দিনে সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে কী ধরনের প্রস্তাব দেয় এবং ঢাকা সেই প্রস্তাবের শর্তগুলো কীভাবে মূল্যায়ন করে—তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের চূড়ান্ত অবস্থান।