ঢাকা অফিস

প্রকাশিত: ২২ আগষ্ট ২০২৬ , ০৬:৩৩ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

পোশাক কারখানার ছাদেই মিলতে পারে ১,৭৬৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ

জ্বালানি সংকটের মধ্যে বড় সম্ভাবনা দেখছে সিপিডি; বিনিয়োগে প্রয়োজন সহজ ঋণ ও সবুজ অর্থায়ন

দেশের চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে পোশাক ও বস্ত্র কারখানার ছাদকে সৌরবিদ্যুতের বড় উৎস হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা সামনে এসেছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণা বলছে, দেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের কারখানাগুলোর ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট-পিক (এমডব্লিউপি) বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।

সিপিডির গবেষণায় প্রায় ৩ হাজার ৩২০টি কারখানা এবং প্রায় ৯৭ লাখ বর্গমিটার ছাদ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকদের হিসাবে, এসব ছাদকে কাজে লাগানো গেলে শিল্পকারখানার বিদ্যুৎ চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সৌরশক্তি থেকে পূরণ করা সম্ভব হবে।

বড় কারখানায় চাহিদার ৪০ শতাংশ পর্যন্ত

গবেষণায় ছোট, মাঝারি ও বড় কারখানার আলাদা সম্ভাবনা হিসাব করা হয়েছে। ছোট কারখানাগুলো থেকে প্রায় ৪৮৫ মেগাওয়াট-পিক, মাঝারি কারখানা থেকে ৬৩৭ মেগাওয়াট-পিক এবং বড় কারখানাগুলো থেকে ৬৪৬ মেগাওয়াট-পিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

একই গবেষণায় দেখা গেছে, বড় একটি কারখানার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব। ছোট কারখানায় এই সম্ভাবনা প্রায় ৩৮ শতাংশ এবং মাঝারি কারখানায় প্রায় ৩৩ শতাংশ।

অর্থাৎ, সৌরবিদ্যুৎ শুধু পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে নয়, শিল্পকারখানার বিদ্যুৎ ব্যয়ের চাপ কমানোর একটি কার্যকর উপায়ও হতে পারে।

সংকটের সময় নতুন সম্ভাবনা

বর্তমানে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি ঘাটতির কারণে বাস্তবে এর প্রায় অর্ধেক ব্যবহার করা যাচ্ছে বলে সিপিডির গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক গ্যাস সরবরাহ সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে।

এ অবস্থায় শিল্পকারখানার নিজস্ব ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নির্ভরতাও কমবে।

বিশেষ করে দিনের বেলায় যখন অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন চলে, তখন সৌরবিদ্যুতের উৎপাদনও সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে। ফলে কারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদনের সময়ের একটি স্বাভাবিক সামঞ্জস্য তৈরি হয়।

বিনিয়োগের প্রয়োজন ১৮৮ মিলিয়ন ডলার

সিপিডির হিসাব অনুযায়ী, চিহ্নিত কারখানাগুলোতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে মোট প্রায় ১৮৮ দশমিক ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। গবেষণায় ৫০৯টি কারখানাকে সরাসরি ‘বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত’ এবং আরও ১ হাজার ৩৫৯টি কারখানাকে সহায়তা পেলে বিনিয়োগযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তবে অর্থায়নই এখানে সবচেয়ে বড় বাধা। সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, সবুজ অর্থায়নের সুদের হার যদি প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হয়, তাহলে আরও অনেক কারখানা সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। কিন্তু বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার প্রায় ১২ শতাংশ হলে বিনিয়োগের উপযোগী কারখানার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

চীনা বিনিয়োগের সম্ভাবনা

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ, বিশেষ করে চীনা বিনিয়োগ আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সিপিডি সহজ শর্তের সবুজ ঋণ, দ্রুত অনুমোদন এবং একাধিক কারখানাকে নিয়ে ক্লাস্টারভিত্তিক বিনিয়োগের সুপারিশ করেছে।

ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জকে প্রাথমিকভাবে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, কারণ এসব এলাকায় বিনিয়োগের উপযোগী পোশাক কারখানার ঘনত্ব বেশি।

বাংলাদেশের শিল্পখাতে জ্বালানি সংকট যখন উৎপাদন ও রপ্তানিকে চাপে ফেলছে, তখন কারখানার অব্যবহৃত ছাদকে বিদ্যুতের উৎসে পরিণত করার এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা একদিকে শিল্পের জ্বালানি ব্যয় কমাতে পারে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারও বাড়াতে পারে।