ঢাকা অফিস

প্রকাশিত: ২২ আগষ্ট ২০২৬ , ০৬:১৭ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

জ্বালানি সংকটে দিনে ২,৩৮৭ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিশ্চয়তায় শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত, বাড়ছে ব্যবসায়িক ব্যয় ও বিনিয়োগের ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক: জ্বালানি সংকট এখন শুধু বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের সমস্যা নয়, এটি দেশের শিল্প উৎপাদন ও অর্থনীতির ওপর সরাসরি বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। জ্বালানি সরবরাহের সংকটে বাংলাদেশের শিল্পখাতে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। শিল্পকারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত থাকছে। এতে উদ্যোক্তাদের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও নতুন বিনিয়োগ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

উৎপাদন কমছে, বাড়ছে খরচ

শিল্পকারখানার জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন না হলে উৎপাদন পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে টেক্সটাইল, পোশাক, ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিক ও অন্যান্য জ্বালানিনির্ভর শিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি।

গ্যাসের চাপ কমে গেলে অনেক কারখানায় উৎপাদনযন্ত্র স্বাভাবিক গতিতে চালানো যায় না। আবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিক, কারখানা, ঋণ ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় চালিয়ে যেতে হয়। ফলে প্রতি ইউনিট পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়।

জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্পকারখানাগুলো বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে বাধ্য হলে ব্যয় আরও বাড়ে। এতে দেশীয় বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বড় ঝুঁকিতে রপ্তানিমুখী শিল্প

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি তৈরি পোশাকশিল্প। এই খাতের হাজার হাজার কারখানা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন ব্যাহত হলে বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এদিকে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করে ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট-পিক পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণায় ৩ হাজার ৩২০টি কারখানার ওপর সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে।

গবেষণাটি দেখিয়েছে, পর্যাপ্ত অর্থায়ন পাওয়া গেলে এসব কারখানার একটি বড় অংশ সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে নিজেদের বিদ্যুতের চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করতে পারে। তবে উচ্চ সুদহার ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে আছে।

সংকটের পেছনে কাঠামোগত সমস্যা

সিপিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের পেছনে শুধু সাময়িক সরবরাহ ঘাটতি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যাও রয়েছে। দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে চাহিদা বাড়ছে। ফলে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট গ্যাস ব্যবহারের ২৮.৮২ শতাংশ আমদানি করা এলএনজি থেকে এসেছে বলে সিপিডির উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান আরও বড় হয়েছে।

সমাধান কোথায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং শিল্পখাতে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ হতে পারে একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প। বিশেষ করে পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানাগুলোতে বড় আকারে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তবে এ জন্য সহজ শর্তে ঋণ, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং কার্যকর নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।

জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান না হলে প্রতিদিনের উৎপাদন ক্ষতির পাশাপাশি এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে দেশের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান, শিল্প বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে। তাই এখন জ্বালানি সরবরাহকে শুধু বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা হিসেবে নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।