প্রকাশিত: ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ , ০৬:১৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক ভয়াবহ মোড় নিয়ে আজ শনিবার সকালে ইরানজুড়ে ‘অভূতপূর্ব’ ও ‘আকস্মিক’ সামরিক অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বাহিনী। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই অভিযানের কোডনেম দিয়েছেন ‘লায়ন’স রোর’ (সিংহের গর্জন), অন্যদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনী একে ‘এপিক ফিউরি’ নামে অভিহিত করেছে। রাজধানী তেহরানসহ ইরানের অন্তত পাঁচটি বড় শহরে একযোগে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলার পর পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তেহরানে খামেনির প্রাসাদ ধ্বংস, শীর্ষ নেতাদের অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা
শনিবার ভোরে তেহরানের অতি-সুরক্ষিত পাস্তৌর জেলায় অন্তত সাতটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রাসাদটি এই হামলায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে রয়টার্স জানিয়েছে, হামলার আগেই খামেনিকে একটি গোপন ও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অক্ষত আছেন বলে দাবি করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ।
বিপত্তি ঘটেছে ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা কমান্ডে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্স ও ইরান ইন্টারন্যাশনাল নিশ্চিত করেছে যে, ইসরায়েলি হামলায় ইরানের শীর্ষ প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের সচিব আলি শামখানি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদেহ এবং আইআরজিসি-র কমান্ডার জেনারেল মোহাম্মদ পাকপৌর নিহত হয়েছেন। এটি ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ভিডিও বার্তায় সরাসরি এই অভিযানে মার্কিন সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইরানি শাসনের আসন্ন হুমকি দূর করে মার্কিন জনগণকে রক্ষা করা।” ইরানি প্রশাসনের উদ্দেশে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আত্মসমর্পণ করুন, নইলে মৃত্যু নিশ্চিত।” তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্রধারী হতে দেওয়া হবে না।
হরমোজগানে বালিকা বিদ্যালয়ে হামলা: ৮৬ শিক্ষার্থীর মৃত্যু
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ হরমোজগানের মিনাব শহরে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। ইরানের শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দিনের আলোতে যখন স্কুলটি শিক্ষার্থীপূর্ণ ছিল, তখনই এই হামলা চালানো হয়। এতে এখন পর্যন্ত ৮৬ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে আল জাজিরা। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই ঘটনাকে ‘নির্মম হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করে এর কঠিন প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।
ইরানের পাল্টা আঘাত: রণক্ষেত্র মধ্যপ্রাচ্য
হামলার পরপরই ইরান পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে। ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিবসহ বিভিন্ন শহরে সাইরেন বাজছে এবং একের পর এক ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানছে। শুধু ইসরায়েল নয়, মার্কিন বাহিনীকে সহযোগিতা করার অভিযোগে পার্শ্ববর্তী আরব দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে তেহরান।
বাহরাইন: মানামায় অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরে হামলা চালিয়েছে ইরান।
সৌদি আরব: রিয়াদ ও বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত: আবুধাবিতে বিস্ফোরণে একজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
কুয়েত ও কাতার: এই দেশগুলোতেও শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটেছে এবং দেশগুলো তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে।
লেবানন সীমান্তে নতুন উত্তেজনা
ইরানে হামলার সমান্তরালে দক্ষিণ লেবাননের ইকলিম আল-তুফাহ অঞ্চলেও ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। গত বৃহস্পতিবারের হামলায় একজন ১৬ বছর বয়সী সিরীয় কিশোর নিহত হওয়ার পর আজ ব্লাত এবং ওয়াদি বারঘৌতি এলাকায় হিজবুল্লাহর স্থাপনা লক্ষ্য করে পুনরায় বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে ইসরায়েল এই হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে লেবানন সরকার।
ইসরায়েলে সর্বোচ্চ সতর্কতা: আন্ডারগ্রাউন্ডে হাসপাতাল
ইরানি পাল্টা হামলার ভয়ে ইসরায়েলজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রধান হাসপাতালগুলোকে মাটির নিচের সুরক্ষিত (আন্ডারগ্রাউন্ড) ইউনিটে স্থানান্তর করার নির্দেশ দিয়েছে। তেল আবিবের সুরাসকি মেডিকেল সেন্টার এবং হাইফার রামবাম হাসপাতাল ইতিমধ্যে তাদের আন্ডারগ্রাউন্ড ফেসিলিটি চালু করেছে। সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধ এখন সরাসরি সংঘাতের রূপ নিল। এই হামলা যদি কয়েক দিন ধরে অব্যাহত থাকে, তবে বিশ্ব অর্থনীতি ও তেলের বাজারে এর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে এবং এটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।