এখন সময় ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ মার্চ ২০২৬ , ০৬:৪৩ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

মধ্যপ্রাচ্যে মহাপ্রলয়: ইরানের ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’ কৌশল ও আঞ্চলিক যুদ্ধের দাবানল

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবথেকে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। গত সপ্তাহের শেষে ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার পর পাল্টে গেছে দৃশ্যপট। বিশেষ করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর তেহরান এখন ‘অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধে’ (Existential War) নেমেছে। এর পাল্টা জবাব হিসেবে ইরান কেবল ইসরায়েল নয়, বরং পারস্য উপসাগরীয় তার প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), সৌদি আরব, ওমান, বাহরাইন, কুয়েত এবং কাতার—সবগুলো দেশেই একযোগে ব্যালাস্টিক মিসাইল ও ড্রোন বর্ষণ করেছে ইরান।

এই আক্রমণ কেবল সামরিক সংঘাত নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য এক অশনি সংকেত। নিম্নে এই যুদ্ধের বহুমুখী সমীকরণ এবং ইরানের কৌশলের বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।

১. অপারেশনাল চিত্র: উপসাগরীয় দেশগুলোতে কেন এই তাণ্ডব?

গত কয়েক দিনে ইরান থেকে শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এমন সব দেশগুলোকে, যারা আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের এই অভিযানে অংশ নেয়নি। তা সত্ত্বেও কেন ইরান তাদের ওপর হামলা চালাচ্ছে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ইরানের সামরিক কৌশল এবং ওই দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর অবস্থানের মধ্যে।

কাতার ও বাহরাইনে সরাসরি আঘাত

কাতারের রাজধানী দোহার অদূরে অবস্থিত আল উদেদ বিমান ঘাঁটি ছিল ইরানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু। এটি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (US-CENTCOM) অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এবং এখানে প্রায় ১০,০০০ মার্কিন সেনা অবস্থান করছে। ইরান জানে যে, এই ঘাঁটি থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের যাবতীয় মার্কিন আকাশপথের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হয়। অন্যদিকে, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের (5th Fleet) সদরদপ্তরেও ইরান আঘাত হেনেছে। এই দুটি ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে ইরান মূলত ওয়াশিংটনকে এই বার্তা দিতে চেয়েছে যে, তাদের কৌশলগত সম্পদগুলো এখন আর সুরক্ষিত নয়।

বিমানে চলাচলে স্থবিরতা

ইরানের এই ব্যাপক মিসাইল বৃষ্টির ফলে পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের আকাশপথ বন্ধ হয়ে গেছে। কুয়েত, ওমান এবং দুবাইয়ের মতো ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলোতে শত শত ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এতে পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্য চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে।

২. ‘অপ্রিয় প্রতিবেশী’ ও ঐতিহাসিক দ্বৈরথ: কেন ইরান নিঃসঙ্গ?

আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইরান বিশাল হলেও প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর কাছে তেহরান সবসময়ই একটি ভীতির নাম।

সৌদি-ইরান প্রক্সি যুদ্ধ: ইয়েমেনকে কেন্দ্র করে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সৌদি আরব ও ইরান এক পরোক্ষ যুদ্ধে লিপ্ত। যদিও সম্প্রতি কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ সেই ক্ষতে নতুন করে নুন ছিটিয়ে দিয়েছে।

বাহরাইনের মালিকানা দাবি: গত বছরের ডিসেম্বরেও ইরান বাহরাইনের ওপর ঐতিহাসিক মালিকানা দাবি করেছিল, যা আরব বিশ্বে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করে।

প্র্যাগম্যাটিক বনাম বৈরি সম্পর্ক: সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান এবং কাতার কিছুটা বাস্তববাদী (Pragmatic) নীতি অবলম্বন করলেও তারা মনে মনে ইরানকে একটি বড় হুমকি হিসেবেই দেখে। এই দেশগুলো সবসময় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে চাইলেও ইরান এখন তাদের ‘শত্রুর আশ্রয়দাতা’ হিসেবে গণ্য করছে।

৩. ইরানের সামরিক কৌশল: ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান জানে যে তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা অবকাঠামো মার্কিন প্রযুক্তির চেয়ে উন্নত নয়। তবুও তারা এই হামলা চালাচ্ছে একটি বিশেষ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে, যাকে বলা হয় ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’ (Forward Defence)।

ক. প্রতিবেশীদের ওপর চাপ সৃষ্টি

ইরান চাচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলো যেন অনুভব করে যে, আমেরিকার সাথে মিত্রতা বজায় রাখার মাসুল তাদের দিতে হবে। ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, যদি যুদ্ধ চলতে থাকে, তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের গত কয়েক দশকের সমৃদ্ধি ও শান্তি মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। ইরান আশা করছে, এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখে আরব দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহারে বাধা দেবে অথবা যুদ্ধবিরতির জন্য ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।

খ. মার্কিন সম্পদকে লক্ষ্যবস্তু করা

মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের ব্যালাস্টিক মিসাইলের আওতার মধ্যে। যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক ড্রোন ভূপাতিত করছে, কিন্তু একসাথে শত শত ড্রোন ও মিসাইল ছুড়ে ইরান মূলত মার্কিন সিস্টেমকে ‘ওভারলোড’ করে দিচ্ছে।

৪. প্রক্সি নেটওয়ার্কের সক্রিয়তা: লেবানন থেকে ইয়েমেন

ইরানের নিয়মিত বাহিনীর পাশাপাশি তাদের প্রক্সি নেটওয়ার্কগুলোও এখন রণক্ষেত্রে সক্রিয়।

হিজবুল্লাহর দ্বিতীয় ফ্রন্ট: লেবানন ভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইতিমধ্যে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে হামলা শুরু করেছে। এর ফলে ইসরায়েলকে এখন দক্ষিণ ও উত্তর—উভয় সীমান্তেই যুদ্ধ করতে হচ্ছে।

হুথি ও ইরাকি মিলিশিয়া: ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোও লোহিত সাগর ও ইরাকের মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা জোরদার করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর ফলে পুরো অঞ্চলটি একটি বহুমুখী যুদ্ধের (Multi-front war) কবলে পড়েছে।

৫. বিশ্ব অর্থনীতিতে আঘাত: হরমুজ প্রণালী ও তেলের বাজার

বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ইরান এই জলপথকে এখন মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ইতিমধ্যে দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার খবর পাওয়া গেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপে গ্যাসের দামও আকাশচুম্বী। যদি এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বিশ্ব এক গভীর অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়বে।

৬. ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে মধ্যপ্রাচ্য

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ বা ২০২৫ সালের উত্তেজনা আর বর্তমান যুদ্ধের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। আগের হামলাগুলো ছিল মূলত ‘পরিমিত’ (Calculated), যার লক্ষ্য ছিল উত্তেজনা কমানো। কিন্তু বর্তমান হামলাগুলো হলো ‘মরণকামড়’।

ঝুঁকি ও সম্ভাবনা:

১. আঞ্চলিক একাত্মতা নাকি বিভাজন? উপসাগরীয় দেশগুলো কি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আরও শক্তভাবে জোট বাঁধবে, নাকি ইরানের হাত থেকে বাঁচতে নিজেদের দূরত্ব কমিয়ে নেবে? এটি একটি বড় প্রশ্ন।

২. ইসরায়েলের অবস্থান: ইসরায়েল এবং আরবের গত দুই বছরের শীতল সম্পর্ক এখন আরব দেশগুলোকে এই যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিতে নিরুৎসাহিত করছে। তারা চায় না ইসরায়েলের হয়ে এই যুদ্ধে তাদের নিজেদের অর্থনীতি ধ্বংস হোক।

৩. অস্ত্রের সীমাবদ্ধতা: ইরানের মিসাইল ভাণ্ডার বিশাল হলেও তা অফুরন্ত নয়। দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে ইরান কতদিন এই সাপ্লাই বজায় রাখতে পারবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

ইরানের বর্তমান সরকার এখন একটি দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া বাঘের মতো। তারা জানে তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে, তাই তারা পুরো অঞ্চলকে বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের লক্ষ্য পরিষ্কার—যদি আমরা ডুবে যাই, তবে সবাইকে নিয়েই ডুবব।

এখন প্রশ্ন হলো, ওয়াশিংটন এবং ইসরায়েল কি এই আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা থামানোর কোনো পথ খুঁজে পাবে, নাকি ইরানের এই ধ্বংসাত্মক কৌশল তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দাবানল জ্বালিয়ে দেবে? মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি মুহূর্ত এখন উৎকণ্ঠার।