বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন

প্রকাশিত: ০১ মে ২০২৬ , ০৪:৩৮ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

আন্তর্জাতিক দাবার চাল: ২০২৬ এর উত্তাল বিশ্ব ও সংকটে মানবতা

বর্তমান পৃথিবীর আকাশ এক অদ্ভুত ধূসর মেঘে আচ্ছন্ন। ২০২৬ সালের এই এপ্রিল মাসের শেষভাগে এসে আমরা যখন বিশ্ব পরিস্থিতির দিকে তাকাই, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক অস্থির, সংঘাতময় এবং চূড়ান্ত অনিশ্চিত এক মানচিত্র। নিউ ইয়র্কের ব্যস্ত রাজপথ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মরুপ্রান্তর কিংবা ইউক্রেনের বিধ্বস্ত শহরতলি, সবখানেই আজ একটিই প্রশ্ন: বিশ্ব কি কোনো নতুন মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে, নাকি এক সম্পূর্ণ নতুন বিশ্বব্যবস্থার জন্মবেদনা সইতে হচ্ছে আমাদের? আধুনিক ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এখন আর কেবল ড্রয়িংরুমের আলোচনা নয়, বরং এটি এখন প্রতিটি মানুষের অস্তিত্বের লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিগত কয়েক দশকের স্থিতিশীলতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন আগ্নেয়গিরির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যে দীর্ঘকালীন ছায়াযুদ্ধ আমরা দেখে আসছিলাম, তা এখন সরাসরি রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক উদ্যোগ 'অপারেশন এপিক ফিউরি' মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক ভয়ংকর মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে। তেহরানের আকাশে ড্রোন আর ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন এখন নিয়মিত ঘটনা। মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে ইরান যেভাবে আধুনিক প্রযুক্তির ডালপালা মেলে প্রতিরোধের দেয়াল তুলেছে, তা পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়িয়ে দিয়েছে। যুদ্ধের ভয়াবহতা কেবল সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নেই; হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার যে হুমকি তেহরান দিয়ে রেখেছে, তা কার্যকর হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এমন এক সুনামি আসবে যার ধাক্কা সইবার সক্ষমতা বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতির নেই। এক ব্যারেল তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়া মানে নিউ ইয়র্ক থেকে ঢাকা—সবখানেই মূল্যস্ফীতির লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়া।

অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধের পঞ্চম বর্ষে এসে আমরা দেখছি এক অদ্ভুত অচলাবস্থা। রাশিয়ার 'অজেয়' হাইপারসনিক মিসাইল কিংবা অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের দাপট যখন ইউক্রেনের উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কাছে থমকে যাচ্ছে, তখন ক্রেমলিনের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে খোদ রাশিয়ার ভেতরেই প্রশ্ন উঠছে। ভ্লাদিমির পুতিনের একগুঁয়েমি আর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপে পিষ্ট সাধারণ রুশ নাগরিকরা আজ এক ক্লান্ত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ঠিক এই সময়েই মার্কিন রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফোনালাপ রাজনীতিতে নতুন এক চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। ট্রাম্পের 'পিস ডিল' বা শান্তি চুক্তির প্রস্তাব অনেককেই আশান্বিত করলেও, ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বের বিসর্জন দিয়ে কি আদেও টেকসই শান্তি সম্ভব? নাকি এটি কেবল পরবর্তী কোনো বড় যুদ্ধের বিরতি মাত্র? ইউক্রেন এখন এমন এক দাবার গুটি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যাকে কেন্দ্র করে একদিকে ন্যাটোর মর্যাদা আর অন্যদিকে রাশিয়ার সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা লড়াই করছে।

অর্থনৈতিক মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, কয়েক দশক ধরে চলে আসা পশ্চিমা আধিপত্যের ভিত্তিগুলো নড়বড়ে হয়ে পড়ছে। ওপেক (OPEC) থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কেবল একটি কূটনৈতিক সংবাদ নয়, এটি হলো কয়েক প্রজন্মের একচেটিয়া তেল-রাজনীতির ভাঙনের শুরু। আরব দেশগুলো এখন আর কেবল পশ্চিমা ইশারায় চলতে রাজি নয়; তারা তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ পুনর্নির্ধারণ করতে চায়। এর পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন চিনা বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সেমিকন্ডাক্টরের ওপর কড়া বাণিজ্য প্রাচীর তোলার চেষ্টা করছে, তখন তথাকথিত 'মুক্ত বাণিজ্য' বা 'গ্লোবালাইজেশন' আজ মৃতপ্রায় এক তত্ত্বে পরিণত হয়েছে। প্রত্যেকে এখন নিজের বাজার বাঁচাতে ব্যস্ত, যাকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন ‘নিও-প্রোটেকশনিজম’ বা নব্য-সংরক্ষণবাদ। এই বাণিজ্যিক যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত বিশ্বের নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে আরও গভীর সংকটে ফেলছে।

পশ্চিমা বিশ্বের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এক অস্থির ক্রান্তিকাল চলছে। ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের প্রতীক রাজা তৃতীয় চার্লস যখন মার্কিন কংগ্রেসে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের গুরুত্ব নিয়ে সতর্কবার্তা দেন, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে খোদ পশ্চিমা আদর্শের মধ্যেই ফাটল ধরেছে। জনপ্রিয়তাবাদ বা পপুলিজমের উত্থান আজ আটলান্টিকের দুই পাড়েই স্পষ্ট। সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে পুঁজি করে উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতাদের উত্থান উদারনৈতিক গণতন্ত্রকে এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো থেকে বামপন্থী ঘরানার সরকারগুলোর বিদায় আর ডানপন্থার প্রত্যাবর্তন এই ইঙ্গিত দেয় যে, মানুষের মোহভঙ্গ ঘটছে দ্রুত। অপরদিকে আফ্রিকা মহাদেশ আজ আর কেবল অনুদান গ্রহণকারী অঞ্চল নয়; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির হাত ধরে তারা বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের হিস্যা বুঝে নিতে চাইছে। গ্লোবাল সাউথের এই জেগে ওঠা আগামী দশকের বিশ্ব রাজনীতিতে এক বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়াবে।

তবে এই সব সংঘাত আর ক্ষমতার লড়াইয়ের আড়ালে যে বড় বিপর্যয়টি নীরবে ঘনিয়ে আসছে, তা হলো জলবায়ু সংকট। ২০২৬ সালের রেকর্ড ভাঙা দাবদাহ আর অনিয়মিত আবহাওয়া আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, প্রকৃতির সীমানা কোনো মারণাস্ত্র দিয়ে রক্ষা করা যায় না। যখন বিশ্বনেতারা পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, তখন কোটি কোটি মানুষ সুপেয় পানি আর খাদ্য সংকটে দিশেহারা। পরিবেশগত এই বিপর্যয় কেবল একটি দেশ বা অঞ্চলের নয়, এটি সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্বের সংকট। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, যুদ্ধ আর ভূ-রাজনীতি আজ জলবায়ু পরিবর্তনের মতো জরুরি ইস্যুকে পেছনের সারিতে ঠেলে দিয়েছে।

নিউ ইয়র্কের মতো বৈশ্বিক কেন্দ্রবিন্দু থেকে যখন আমরা এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করি, তখন প্রবাসী বাঙালিদের এবং বিশ্ববাসীর জন্য বার্তাটি স্পষ্ট—আমরা এক জটিল ও বহুমুখী সংকটের যুগে বাস করছি। এখানে রাজনীতি, অর্থনীতি আর নিরাপত্তা একে অপরের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। আজকের দিনে কোনো দেশই দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন নয়। মধ্যপ্রাচ্যের একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত নিউ ইয়র্কের শেয়ার বাজারে কম্পন সৃষ্টি করে, আর ইউক্রেনের শস্যক্ষেত্রের স্থবিরতা আফ্রিকার শিশুর মুখে অন্ন কেড়ে নেয়।

উপসংহারে বলা যায়, ২০২৬ সালের এই প্রেক্ষাপটটি হলো রূপান্তরের। পুরনো ব্যবস্থার ধ্বংসস্তূপের ওপর নতুন কিছু জন্ম নেওয়ার সময়। কিন্তু সেই নতুন পৃথিবী কি আরও বেশি সংঘাতময় হবে, নাকি আলোচনার টেবিলে বসে প্রজ্ঞার পরিচয় দেবেন বিশ্বনেতারা? ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, যখন কূটনীতি ব্যর্থ হয়, তখন কেবল রক্তপাতই অবশিষ্ট থাকে। বর্তমানের এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমঝোতা। আস্ফালন আর শক্তি প্রদর্শনের এই উন্মাদনা বন্ধ না হলে সভ্যতা হয়তো এমন এক অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাবে, যেখান থেকে ফেরার পথ আর থাকবে না। 'এখন সময়' আমাদের সতর্ক হওয়ার, 'এখন সময়' বিশ্বজুড়ে শান্তির সপক্ষে জোরালো আওয়াজ তোলার।