বিশ্লেষণমূলক বিশেষ প্রতিবেদন

প্রকাশিত: ২২ মে ২০২৬ , ০৬:৩১ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

আন্তর্জাতিক দাবার চাল: ২০২৬ এর উত্তাল বিশ্ব ও মানবতার সংকট

বর্তমান পৃথিবীর আকাশ এক অদ্ভুত ধূসর মেঘে আচ্ছন্ন। ২০২৬ সালের মে মাসের এই শেষভাগে এসে আমরা যখন বিশ্ব পরিস্থিতির দিকে তাকাই, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক অস্থির সংঘাতময় এবং চূড়ান্ত অনিশ্চিত এক মানচিত্র। নিউ ইয়র্কের ব্যস্ত রাজপথ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মরুপ্রান্তর, ইউক্রেনের বিধ্বস্ত শহরতলি কিংবা হিমশীতল গ্রিনল্যান্ড, সবখানেই আজ একটিই প্রশ্ন: বিশ্ব কি কোনো নতুন মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে, নাকি এক সম্পূর্ণ নতুন বিশ্বব্যবস্থার জন্মবেদনা সইতে হচ্ছে আমাদের? আধুনিক ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক ভূ রাজনীতি এখন আর কেবল ড্রয়িংরুমের আলোচনা নয় বরং এটি এখন প্রতিটি মানুষের অস্তিত্বের লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিগত কয়েক দশকের স্থিতিশীলতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক মহাসংকটের মুখোমুখি। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাত মে মাসে এসে অত্যন্ত জটিল মোড় নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন যে ইরানের সাথে মার্কিন যুদ্ধবিরতি কেবল নামমাত্র কার্যকর রয়েছে, কারণ তেহরানের পক্ষ থেকে দেওয়া যুদ্ধ শেষ করার এবং হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার প্রস্তাবকে ওয়াশিংটন অত্যন্ত দুর্বল বা 'বোকামি' বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। এর মধ্যেই এক চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস হয়েছে যে, পারস্য উপসাগরে ইরানের লিভান দ্বীপের তেল শোধনাগারে সংযুক্ত আরব আমিরাত গোপনে সামরিক হামলা চালিয়েছে, যাকে ট্রাম্প প্রশাসন পরোক্ষভাবে স্বাগত জানিয়েছে। যদিও কাতার, সৌদি আরব এবং আরব আমিরাতের অনুরোধে ইরানের ওপর একটি আসন্ন বড় ধরনের মার্কিন বিমান হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে, তবুও মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যেকোনো মুহূর্তে স্থায়ী যুদ্ধের আগুনে জ্বলে উঠতে পারে। তেলের বাজারে এই উত্তেজনার ফলে বিশ্বজুড়ে যে মূল্যস্ফীতির লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ছে, তার আঁচ নিউ ইয়র্ক থেকে ঢাকা পর্যন্ত প্রতিটি সাধারণ মানুষ টের পাচ্ছে।

এদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধের অচলাবস্থার মাঝেই মে মাসে বৈশ্বিক কূটনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বেইজিং। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মে মাসের মাঝামাঝিতে চীন সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন, যেখানে মস্কো ও বেইজিং নিজেদের কৌশলগত ও সামরিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। রাশিয়ার এই চীন নির্ভরতা যখন পশ্চিমা বিশ্বকে ভাবিয়ে তুলছে, ঠিক তখনই মার্কিন কূটনীতিতে দেখা দিয়েছে এক নতুন মেরুকরণ। বেইজিংয়ে শি জিনপিংয়ের সাথে ট্রাম্পের বৈঠকের পর চীন কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে যে তাইওয়ানের স্বাধীনতা এবং তাইওয়ান প্রণালীর শান্তি কখনোই একসাথে চলতে পারে না। ট্রাম্প প্রশাসন যেখানে তাইওয়ানের জন্য বরাদ্দকৃত ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজ আটকে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তাকে বিশ্লেষকরা চীনের জন্য এক বড় কূটনৈতিক বিজয় এবং মার্কিন দীর্ঘমেয়াদী নীতির এক বড় বিচ্যুতি হিসেবে দেখছেন।

অর্থনৈতিক এবং আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই এখন কেবল এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে খোদ আর্কটিক অঞ্চলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বা বড় ধরনের ভূমিকা প্রতিষ্ঠার জন্য পর্দার আড়ালে তীব্র চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, যা গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় কর্মকর্তাদের চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই গ্রিনল্যান্ড কৌশল এবং তাইওয়ান গ্যাম্বিট প্রমাণ করে যে বর্তমান ওয়াশিংটন প্রশাসন বহুপাক্ষিক জোটের চেয়ে একতরফা জাতীয় স্বার্থ এবং ভূখণ্ডগত প্রভাবকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। একই সাথে লাতিন আমেরিকার ভূ রাজনীতিতেও চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে, কারণ মার্কিন বিচার বিভাগ কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এনে আনুষ্ঠানিক চার্জশিট দাখিল করেছে, যা আমেরিকার দোরগোড়ায় কিউবা ও মার্কিন উত্তেজনাকে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

পশ্চিমা বিশ্বের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক অনুশাসনের ক্ষেত্রেও মে মাসে এক বড় ধরনের আদর্শিক ফাটল স্পষ্ট হয়েছে। জাতিসংঘ যখন জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় একটি ঐতিহাসিক বৈশ্বিক রায়কে সমর্থন দিয়েছে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে সেই রেজোলিউশন বা প্রস্তাবটি আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার এই একাকীত্ব এবং পরিবেশ নীতি থেকে সরে আসা ইঙ্গিত দেয় যে গ্লোবাল নর্থ বা উন্নত দেশগুলোর মধ্যে আদর্শিক দূরত্ব কতটা গভীর হচ্ছে। অপরদিকে, আফ্রিকার দেশগুলোতে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার সাথে এবার যোগ হয়েছে এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকট। মধ্য আফ্রিকায় ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মহামারি রূপ ধারণ করেছে, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে যে আক্রান্তের সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়েছে এবং ইতিমধ্যেই প্রায় ১৪০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে যে এই মহামারির প্রকৃত আকার আরও বড় এবং এর কার্যকর ভ্যাকসিন আসতে আরও অন্তত নয় মাস সময় লাগতে পারে, যা আফ্রিকার ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে।

নিউ ইয়র্কের মতো বৈশ্বিক কেন্দ্রবিন্দু থেকে যখন আমরা এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করি, তখন প্রবাসী বাঙালি এবং বিশ্ববাসীর জন্য বার্তাটি স্পষ্ট: আমরা এক নতুন ও বিশৃঙ্খল ‘মাল্টিপোলার’ বা বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার যুগে প্রবেশ করেছি। এখানে রাজনীতি, অর্থনীতি, মহামারি আর নিরাপত্তা একে অপরের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। আজকের দিনে কোনো দেশই দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন নয়। পারস্য উপসাগরের তেল শোধনাগারে হওয়া ড্রোন হামলা নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ার বাজারে কাঁপন ধরায়, আর বেইজিংয়ের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি তাইওয়ান প্রণালীকে উত্তপ্ত করে তোলে।

উপসংহারে বলা যায়, ২০২৬ সালের মে মাসের এই প্রেক্ষাপটটি হলো এক মহা-রূপান্তরের। পুরনো বিশ্বব্যবস্থার ধ্বংসস্তূপের ওপর জন্ম নিচ্ছে এক নতুন, সংরক্ষণবাদী এবং ক্ষমতা-ভিত্তিক পৃথিবী। কিন্তু সেই নতুন পৃথিবী কি আরও বেশি সংঘাতময় হবে, নাকি আলোচনার টেবিলে বসে প্রজ্ঞার পরিচয় দেবেন বিশ্বনেতারা? ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, যখন কূটনীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ব্যর্থ হয়, তখন কেবল রক্তপাতই অবশিষ্ট থাকে। বর্তমানের এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো বৈশ্বিক সহযোগিতা। আস্ফালন আর শক্তি প্রদর্শনের এই উন্মাদনা বন্ধ না হলে সভ্যতা হয়তো এমন এক অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাবে, যেখান থেকে ফেরার পথ আর থাকবে না। 'এখন সময়' আমাদের সতর্ক হওয়ার, 'এখন সময়' বিশ্বজুড়ে শান্তির সপক্ষে জোরালো আওয়াজ তোলার।