প্রকাশিত: ০৫ মার্চ ২০২৬ , ১০:০৩ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য এমন এক অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে যার উত্তাপ আজ কেবল এই অঞ্চলের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির মেরুদণ্ড কাঁপিয়ে দিচ্ছে। ৫ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত আর কোনো ছায়াযুদ্ধ বা প্রক্সি ওয়ারের পর্যায়ে নেই, এটি এখন একটি সরাসরি এবং ভয়াবহ আঞ্চলিক মহাযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। গত ১ মার্চ ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর ঘটনাটি এই সংকটের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দিয়েছে। এই ঘটনার পর ইরান তার সমস্ত প্রক্সি শক্তি এবং নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা নিয়ে সর্বাত্মক পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে, যা তেহরান থেকে বৈরুত এবং রিয়াদ থেকে কুয়েত পর্যন্ত এক বিশাল যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করেছে।
ইরানের অভ্যন্তরে ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে, যার মূল লক্ষ্য হলো দেশটির পারমাণবিক ও সামরিক অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া। এর বিপরীতে ইরান ও তার মিত্র হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চল এবং হাইফা ও তেল আবিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে বৃষ্টির মতো রকেট ও ড্রোন বর্ষণ করছে। লেবানন ফ্রন্ট এখন পুরোপুরি উন্মুক্ত; হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলি স্থলবাহিনীর সংঘাত দক্ষিণ লেবাননকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। সংঘাতের আঁচ লেগেছে উপসাগরীয় দেশগুলোতেও। কুয়েত, কাতার এবং সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইলের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে, যা এই দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে রিয়াদের মার্কিন দূতাবাসে ড্রোন হামলা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশসীমায় শত শত ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনা প্রমাণ করে যে, যুদ্ধ এখন আর কোনো সীমানার তোয়াক্কা করছে না।
এই ক্রমবর্ধমান সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী চরম উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে কুয়েত ও কাতারে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলার ঘটনায় সেখানে কর্মরত হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক জীবনঝুঁকির মুখে পড়েছেন। লেবানন ও ইসরায়েল সীমান্তে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ায় বৈরুত ও এর আশপাশের এলাকায় থাকা প্রবাসীরা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য হাহাকার করছেন। আকাশসীমা বন্ধ থাকায় তাঁদের সরিয়ে নেওয়া বা নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করাও দুরুহ হয়ে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলো জরুরি সেল গঠন করেছে। প্রবাসীদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে এবং যেকোনো প্রয়োজনে স্থানীয় দূতাবাসের নির্ধারিত হটলাইন নম্বরগুলোতে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে প্রবাসীদের সরিয়ে নিতে সরকার ইতিমধ্যে একটি জরুরি উদ্ধার পরিকল্পনা (ইভাকুয়েশন প্ল্যান) চূড়ান্ত করছে এবং পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটের ব্যবস্থা করার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
এই যুদ্ধের অন্য এক ভয়াবহ দিক হলো গাজা ও লেবাননের সাধারণ মানুষের আর্তনাদ। একদিকে যখন বড় শক্তিগুলো ক্ষেপণাস্ত্রের হিসাব মেলাচ্ছে, অন্যদিকে গাজায় মানবিক ত্রাণ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ইসরায়েল যুদ্ধের অজুহাতে গাজার ওপর অবরোধ আরও কঠোর করেছে, যা সেখানে এক চরম দুর্ভিক্ষ ও মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে শুরু করেছে, যা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন এবং ইরানের কট্টরপন্থী সামরিক নেতৃত্বের অনড় অবস্থান এই সংকটকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে যেখান থেকে কূটনৈতিক উপায়ে ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিশ্ববাসী আজ রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছে এই সংঘাতের পরবর্তী ধাপের দিকে, যা যেকোনো মুহূর্তে একটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করতে পারে।