প্রকাশিত: ০৪ মার্চ ২০২৬ , ০৬:৪৪ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। দ্রুততম সময়ের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে এই রক্তক্ষয়ী সংকট সমাধানে ওয়াশিংটনকে কার্যকর ও শক্তিশালী ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বুধবার (৪ মার্চ) ঢাকা সফররত মার্কিন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান। বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়।
যুদ্ধের খতিয়ান: হতাহত ও অর্থনৈতিক শঙ্কা
বৈঠক শেষে ব্রিফিংকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে ইতিমধ্যে বাংলাদেশের নাগরিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি পল কাপুরের কাছে উল্লেখ করেছি যে, চলমান যুদ্ধে আমাদের দুজন বাংলাদেশি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং সাতজন আহত হয়েছেন। এই যুদ্ধ যদি আরও দীর্ঘতর বা বিস্তৃত হয়, তবে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা আরও বাড়বে।”
ড. খলিলুর রহমান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, যুদ্ধ কেবল জানমালের ক্ষতি করছে না, বরং বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি করছে। তিনি বলেন, “আমাদের মতো দেশের পক্ষে এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক যে প্রতিক্রিয়া ও মূল্যস্ফীতির চাপ হবে, সেটা বহন করা দুঃসাধ্য। আমরা তাদের বলেছি, যত দ্রুত সম্ভব আলোচনার মাধ্যমে এবং কূটনৈতিক পথ উন্মুক্ত করে এই সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র যেন কার্যকর উদ্যোগ নেয়।”
পেন্টাগনের হাত কি বাধা?
ব্রিফিংকালে এক সাংবাদিক প্রশ্ন তোলেন যে, যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে মার্কিন পক্ষ কোনো সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দিয়েছে কি না। জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাস্তবসম্মত অবস্থান তুলে ধরে বলেন, “যুদ্ধ কবে বন্ধ হবে সেটা তো সম্পূর্ণ তাদের হাতেও নেই। এটা তো কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না।”
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক
পল কাপুরের সঙ্গে আলোচনার অন্যান্য দিক তুলে ধরে ড. খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন স্পষ্ট। তিনি বলেন, “আমরা জানিয়েছি যে ‘বাংলাদেশ প্রথম’ (Bangladesh First) এই নীতিতে আমরা চলব। আমাদের জাতীয় স্বার্থ সম্পূর্ণভাবে বজায় রেখে অন্যান্য সব দেশের সঙ্গে আমরা পররাষ্ট্র কর্মকাণ্ড নির্বাহ করব।”
মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বর্তমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং আশা ব্যক্ত করেছেন যে, আগামী দিনগুলোতে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক আরও দৃঢ় ও বিস্তৃত হবে।
রোহিঙ্গা ও অনথিভুক্ত বাংলাদেশিদের প্রত্যাবর্তন
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট ও প্রবাসীদের বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান:
রোহিংয়া সংকট: দীর্ঘায়িত রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে একমত পোষণ করেছে। তারা এই সংকট দ্রুত নিরসনে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
অনথিভুক্ত বাংলাদেশি: যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বৈধ কাগজপত্রবিহীন বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া নিয়ে কথা হয়েছে। এই প্রত্যাবর্তন যেন সম্মানজনক হয় এবং আইনি প্রক্রিয়া যেন সহজ হয়, সে বিষয়ে দুই দেশ একযোগে কাজ করতে রাজি হয়েছে।
ঢাকার কূটনৈতিক ভারসাম্য ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং পল কাপুরের সফর ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বাংলাদেশ এখন এক কঠিন কূটনৈতিক ভারসাম্যের পথে হাঁটছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ও সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হচ্ছে, যা বাংলাদেশের আমদানি নির্ভর অর্থনীতিকে সরাসরি আঘাত করছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন বাংলাদেশের অন্যতম বড় রপ্তানি বাজার এবং উন্নয়ন সহযোগী।
অর্থনৈতিক চাপ বনাম জাতীয় স্বার্থ:
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির মাধ্যমে ঢাকা বিশ্বশক্তিগুলোকে বার্তা দিতে চাচ্ছে যে, কোনো বিশেষ শিবিরের হয়ে নয় বরং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাই এখন সবথেকে বড় অগ্রাধিকার। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা মানেই রেমিট্যান্স প্রবাহে বিঘ্ন এবং জ্বালানি সংকট—যা সামাল দেওয়া ঢাকার জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
রোহিংয়া ও প্রত্যাবাসন:
রোহিংয়া ইস্যুতে মার্কিন সমর্থন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় বিজয় হিসেবে দেখা হলেও, মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন কতটুকু হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। তবে অনথিভুক্ত বাংলাদেশিদের ‘সম্মানজনক’ প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোতে নতুন মোড় নিতে পারে।
পল কাপুরের এই সফর এবং ঢাকার স্পষ্ট অবস্থান প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক সংকটে কেবল দর্শক নয়, বরং নিজের স্বার্থ রক্ষায় বিশ্বমঞ্চে সোচ্চার। তবে মধ্যপ্রাচ্যের আগুন দ্রুত না নিভলে কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলের চেয়েও বেশি চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের পকেটে।