প্রকাশিত: ০৪ মার্চ ২০২৬ , ০৬:৪৪ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
চিকিৎসায় চরম অবহেলা, গাফিলতির কারণে চার রোগীর মৃত্যু এবং ভুল মেডিকেল রিপোর্ট প্রদানের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ১০ চিকিৎসকের নিবন্ধন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)। দেশের চিকিৎসা সেবার ইতিহাসে পেশাগত অসদাচরণের বিরুদ্ধে এটিকে একটি বড় শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বুধবার (৪ মার্চ) বিএমডিসির রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. লিয়াকত হোসেন স্বাক্ষরিত পৃথক ১০টি নোটিশের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলের ৫৪তম সাধারণ সভায় এই চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগ ও শাস্তির ধরণ
বিএমডিসি সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে আনীত অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগগুলো দীর্ঘ তদন্তের পর প্রমাণিত হয়েছে। ‘বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০’ অনুযায়ী তাদের নাম কাউন্সিলের রেজিস্টার থেকে সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এই স্থগিতাদেশ চলাকালীন অভিযুক্ত চিকিৎসকরা দেশের কোথাও কোনো ধরণের চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে পারবেন না এবং নিজেদের ‘চিকিৎসক’ হিসেবে পরিচয় দিতে পারবেন না।
যাদের নিবন্ধন স্থগিত করা হয়েছে
শাস্তিপ্রাপ্ত ১০ চিকিৎসকের মধ্যে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী স্থগিতাদেশের মেয়াদে ভিন্নতা রয়েছে:
১. ২ বছরের স্থগিতাদেশ:
রাজধানীর মালিবাগের জে এস ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিক্যাল চেকআপ সেন্টারের ডা. ইশতিয়াক আজাদ ও ডা. এস এম মুক্তাদির। তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অবহেলার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দুই বছরের জন্য প্র্যাকটিস নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
২. ১ বছরের স্থগিতাদেশ:
ঝিনাইদহের শৈলকুপা প্রাইভেট শিশু হাসপাতাল ও ছন্দা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দুই চিকিৎসক ডা. তৌহিদুর রহমান ও ডা. সোহেলী ইসলাম।
৩. ৬ মাসের স্থগিতাদেশ:
বাড্ডার ইউনাইটেড মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ডা. তাসনুভা মাহজাবীন ও ডা. সৈয়দ সাব্বির আহমেদ।
মালিবাগের জে এস ডায়াগনস্টিকের ডা. মাহবুব মোরশেদ।
টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের আলোক হেলথ কেয়ারের তিন চিকিৎসক— ডা. মেরিনা জেসমিন, ডা. মো. শাইখুল আরাফাত ও ডা. মো. এছহাক আলী।
ঘটনার নেপথ্যে: ৪ মৃত্যু ও আর্থিক ক্ষতি
বিএমডিসির তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজধানীর মালিবাগ ও বাড্ডাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসকদের সরাসরি গাফিলতির কারণে চারজন রোগীর করুণ মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া একজন রোগীকে ভুল প্যাথলজিক্যাল রিপোর্ট প্রদান করে তাকে শারীরিক ও বড় ধরণের আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলার দায়ে কয়েকজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। বিশেষ করে খৎনা করাতে গিয়ে বা সাধারণ অস্ত্রোপচারের সময় অ্যানেস্থেসিয়া ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির বিষয়গুলো তদন্তে উঠে আসে।
বিএমডিসির কঠোর অবস্থান
বিএমডিসির নোটিশে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, জনস্বার্থ রক্ষা এবং চিকিৎসা পেশার পবিত্রতা ও মান বজায় রাখতেই এই কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। কাউন্সিলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, "চিকিৎসক হিসেবে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কারো নেই। তদন্তে যাদের অবহেলা পাওয়া গেছে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হয়নি।"
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠলেও প্রতিকার পাওয়ার হার ছিল খুবই কম। বিএমডিসির এই ত্বরিত ও কঠোর পদক্ষেপ ভবিষ্যতে চিকিৎসকদের আরও দায়িত্বশীল হতে বাধ্য করবে। তবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, কেবল নিবন্ধন স্থগিত নয়, স্থায়ীভাবে লাইসেন্স বাতিল এবং ফৌজদারি আইনেও বিচার হওয়া প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, স্থগিতাদেশের এই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের পুনরায় প্র্যাকটিস করার অনুমতি পেতে কাউন্সিলের কাছে আবেদন করতে হবে এবং বিশেষ পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে।