প্রকাশিত: ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ , ১১:২৮ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি অদ্ভুত পুনরাবৃত্তি আছে। প্রতিটি নির্বাচনকে মানুষ কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন হিসেবে দেখে না, দেখে নিজেদের ভাগ্যের সম্ভাব্য পরিবর্তন হিসেবে। তাই নির্বাচন মানে শুধু ব্যালট বাক্স নয়, এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক পুনর্লিখনের মুহূর্ত। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনটিও তেমনই এক সন্ধিক্ষণ। ত্রুটি-বিচ্যুতি, অনিয়মের অভিযোগ, বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, এসব থেকে পুরোপুরি মুক্ত না হলেও বহু পর্যবেক্ষকের ভাষায় এটি সাম্প্রতিক অতীতের তুলনায় অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য একটি ভোট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আর ফলাফল: বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। রাজনীতির চেয়েও বড় একটি সামাজিক মনস্তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে- “এবার কি কিছু বদলাবে?”
এই প্রশ্নটি কেবল দলবদলের প্রশ্ন নয়, রাষ্ট্রের আস্থা সংকটের প্রশ্ন। গত এক দশকে বাংলাদেশে নির্বাচনী অংশগ্রহণের হার ক্রমাগত প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। ২০১৪ সালে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন আসন, ২০১৮ সালে রাতের ভোট বিতর্ক। এসব ঘটনার পর সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ ভোটকে কার্যকর নাগরিক অধিকার হিসেবে বিশ্বাস করতে পারছিল না। এবারের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে দৃশ্যমান উপস্থিতি, বিশেষ করে তরুণ ও নারী ভোটারের অংশগ্রহণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে সেটিই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন ও পর্যবেক্ষক সূত্রের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী শহরাঞ্চলে তরুণ ভোটারের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, এবং গ্রামাঞ্চলে নারী ভোটারদের লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেওয়ার দৃশ্য নির্বাচনটির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।
এই অংশগ্রহণের পেছনে তিনটি কারণ স্পষ্ট। প্রথমত, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাতের পর মানুষ স্থিতিশীলতা চায়। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা। মানুষকে রাজনীতির প্রতি নতুন করে আগ্রহী করেছে। তৃতীয়ত, একটি মনস্তাত্ত্বিক কারণ, মানুষ বিশ্বাস করতে চেয়েছে যে তাদের ভোট এবার গণনায় আসতে পারে। গণতন্ত্রের মৌলিক শর্তই হচ্ছে এই বিশ্বাস, যখন ভোটার মনে করে তার ভোটের ফল আছে, তখনই রাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবে বৈধতা পায়।
বিএনপির বিজয় তাই কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন নয়, এটি “প্রত্যাশার ম্যান্ডেট”। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার অর্থ হচ্ছে মানুষ শুধু সরকার পরিবর্তন চায়নি, নীতির পরিবর্তনও চেয়েছে। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ভোটারদের তিনটি বড় প্রত্যাশা রয়েছে: আইনের শাসন, অর্থনৈতিক স্বস্তি, এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা।
আইনের শাসনের প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক মামলার বিস্তার, গ্রেপ্তার ও প্রতিহিংসার অভিযোগ রাষ্ট্রের ওপর আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নতুন সরকার যদি প্রথম একশ দিনের মধ্যে বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক মামলার স্বচ্ছ পর্যালোচনা এবং পুলিশ প্রশাসনের পেশাদারীকরণে দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে পারে, তাহলে সেটিই হবে তাদের প্রথম বড় সাফল্য। কারণ মানুষ আসলে উন্নয়ন নয়, আগে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার চায়।
অর্থনীতির ক্ষেত্রটি আরও কঠিন। নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই একটি বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। রাজনৈতিক বিজয় মানেই অর্থনৈতিক সাফল্য নয়। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মধ্যে, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ উচ্চমাত্রায়, এবং মূল্যস্ফীতি মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা ক্ষয় করছে। জনগণ যে “দাম কমবে” এই প্রত্যাশা নিয়ে সরকার পরিবর্তন সমর্থন করেছে, সেটিই নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি। কারণ অর্থনীতি তাৎক্ষণিকভাবে পরিবর্তনযোগ্য নয়। এখানে প্রয়োজন হবে নীতিগত আস্থা পুনর্গঠন। ব্যাংক সংস্কার, কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি। রাজনৈতিক প্রতিশোধের বদলে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে মনোযোগ দিতে না পারলে জনসমর্থন দ্রুত ক্ষয় হবে।
প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার প্রশ্নটি ভবিষ্যৎ নির্বাচন ও গণতন্ত্রের জন্য নির্ধারক। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় সমস্যা ছিল “রাষ্ট্রদলীয়করণ”। যে দল ক্ষমতায় যায়, রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের অংশ বানানোর চেষ্টা করে। এবারের নির্বাচনে জনগণের একটি স্পষ্ট বার্তা আছে: তারা দল পরিবর্তন করেছে, কিন্তু একই আচরণের পুনরাবৃত্তি চায় না। নতুন সরকার যদি প্রশাসনকে দলীয় নিয়ন্ত্রণের বদলে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় ফিরিয়ে আনতে পারে, তাহলে সেটিই হবে গণতন্ত্রের প্রকৃত পুনরুদ্ধার।
একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: নারী ও তরুণ ভোটারদের আচরণ। বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, তারা আদর্শগত রাজনীতির চেয়ে জীবনযাত্রার প্রশ্নে ভোট দিয়েছে: কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, শিক্ষা, অনলাইন স্বাধীনতা। অর্থাৎ তারা অতীতের রাজনৈতিক স্মৃতির ভিত্তিতে নয়, ভবিষ্যতের সম্ভাবনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই প্রজন্ম রাজনৈতিকভাবে কম আবেগী কিন্তু বেশি বাস্তববাদী। তারা স্লোগান নয়, ফলাফল চায়। ফলে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রত্যাশা ব্যবস্থাপনা। প্রচার দিয়ে নয়, দৃশ্যমান ফল দিয়ে আস্থা ধরে রাখা।
তবে সতর্কতাও আছে। বাংলাদেশের ইতিহাস বলে ক্ষমতায় আসার পর প্রায় সব সরকারই বিরোধী দলকে দুর্বল করতে ব্যস্ত হয়েছে, ফলে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। যদি নতুন সরকারও একই পথে হাঁটে, তাহলে এই নির্বাচনের ইতিবাচক অর্জন দ্রুত হারিয়ে যাবে। আর যদি তারা রাজনৈতিক সহনশীলতা, সংসদের কার্যকারিতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে তাহলে এটিই হতে পারে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংঘাত থেকে বের হওয়ার সূচনা।
শেষ পর্যন্ত নির্বাচনটির প্রকৃত মূল্যায়ন ব্যালটের ফল দিয়ে হবে না, হবে পরবর্তী পাঁচ বছরের আচরণ দিয়ে। মানুষ সরকার বদলেছে। এবার তারা শাসনব্যবস্থার চরিত্র বদল দেখতে চায়। এই প্রত্যাশা পূরণ হলে নির্বাচনটি ইতিহাসে একটি “টার্নিং পয়েন্ট” হিসেবে থাকবে। আর ব্যর্থ হলে এটিও অতীতের মতো আরেকটি হারানো সম্ভাবনা হয়ে যাবে। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই: ক্ষমতা জনগণ দেয়, কিন্তু বৈধতা সরকারকে প্রতিদিন অর্জন করতে হয়।