কাজী শামসুল হক

প্রকাশিত: ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ , ০৬:১৭ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

প্রতিবাদের ভাষা ও বিপ্লবের ঐতিহ্য

ইনকিলাব, আজাদি ও ইনসাফ শব্দগুলো নিয়ে সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল ঝড় উঠেছে। সাধারণের জ্ঞাতার্থে এ প্রশঙ্গে কিছু বর্ণনা দেয়া দরকার মনে করলাম। শব্দগুলো মূলত বিদেশি উৎস থেকে এলেও এগুলো এখন আমাদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শব্দগুলোর উৎস, অর্থ ও বাঙালির জনজীবনে এগুলোর মিশে যাওয়ার একটি সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ এখানে দেওয়ার চেষ্টা করা হলো:

১. ইনকিলাব (Inquilab) এটি মূলত একটি আরবি শব্দ (انقلاب) যা ফারসি ও উর্দুর মাধ্যমে বাংলায় এসেছে। এর আক্ষরিক অর্থ হলো উল্টানো, পরিবর্তন বা বিপ্লব।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ১৯২১ সালে মাওলানা হাসরত মোহানি (যিনি মওলানা ভাসানীর চিন্তাগুরু ছিলেন) 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ' স্লোগানটি প্রথম ব্যবহার করেন এবং পরবর্তীকালে শহীদ ভগত সিং এটিকে দেশজুড়ে জনপ্রিয় করে তোলেন। এটি নিছক একটি শব্দ নয় বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত পরিবর্তনের সংকল্প। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও এটি একটি শক্তিশালী স্লোগান হিসেবে ফিরে এসেছে।

২. আজাদি (Azadi) এটি একটি ফারসি শব্দ (آزادی) যা উর্দু ও হিন্দি হয়ে বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারে যুক্ত হয়েছে।

এর অর্থ হলো স্বাধীনতা, মুক্তি বা স্বনির্ভরতা।

ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেতে বিপ্লবী ও সাধারণ মানুষ এই শব্দটি আঁকড়ে ধরেছিলেন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর 'আজাদ হিন্দ ফৌজ' বা বর্তমান সময়ের বিভিন্ন নাগরিক আন্দোলনে শোষণের হাত থেকে রেহাই পেতে 'আজাদি' শব্দটি মুক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

৩. ইনসাফ (Insaaf) এটি মূলত একটি আরবি শব্দ (إنصاف), যা ইসলামী মূল্যবোধ ও দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে বাংলা ভাষার প্রাত্যহিক শব্দ হিসেবে মিশে গেছে। এর মূল অর্থ হলো ন্যায়বিচার, সঠিক পাওনা প্রদান বা সাম্য।

ইনসাফ শব্দটি একটি নৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানকে নির্দেশ করে। যখনই সমাজে বিচারহীনতা বা বৈষম্য মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখন সাধারণ মানুষ 'ইনসাফ' বা ন্যায়বিচারের দাবি তোলে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে একটি 'ইনসাফভিত্তিক' রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন এই শব্দটিকে নতুন করে প্রাণ দিয়েছে।

বাংলা একটি মিশ্র ও জীবন্ত ভাষা। ভাষা গবেষকদের মতে, বাংলার শব্দভাণ্ডারের একটি বড় অংশই বিদেশি শব্দ থেকে নেওয়া। ইনকিলাব, আজাদি ও ইনসাফ এই শব্দগুলো হাজার বছরের সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়া ও ব্রিটিশবিরোধী মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে বাঙালির বক্ষনিঃসৃত শব্দে পরিণত হয়েছে। এগুলো এখন আর কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের বা দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। বরং বাঙালির আত্মপরিচয়, প্রতিবাদ ও ন্যায়বিচারের ভাষার অবিচ্ছেদ্য সম্পদ।