এখন সময় ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বার ২০২৬ , ০৯:২১ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

আদালতের বাধায় বড় ধাক্কা ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অভিবাসন নীতিতে পরপর দুটি বড় আইনি বাধা তৈরি হয়েছে। বিদেশি শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ভিসার মেয়াদ সীমিত করার প্রস্তাব আটকে দিয়েছেন একটি ফেডারেল আদালতের বিচারক। একই সময়ে খাদ্য সহায়তা ও মেডিকেইডের মতো সরকারি সুবিধা গ্রহণকারী অভিবাসীদের গ্রিন কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগের বিরুদ্ধে ২২টি অঙ্গরাজ্য ও ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া মামলা করেছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় সোমবার বোস্টনের একটি ফেডারেল আদালত ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত ভিসা বিধি কার্যকর হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। বিধিটি মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।

ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির (ডিএইচএস) প্রস্তাবিত বিধিতে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের ক্ষেত্রে বিদেশি শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির অংশগ্রহণকারী এবং সাংবাদিকদের জন্য নতুন সময়সীমা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছিল।

প্রস্তাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের এফ ভিসা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের জে ভিসার মেয়াদ সর্বোচ্চ চার বছর নির্ধারণ করা হতো। সাংবাদিকদের আই ভিসার ক্ষেত্রে আরও কঠোর সীমা আরোপের প্রস্তাব ছিল। বর্তমানে কয়েক বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকতে পারা এই ভিসার মেয়াদ ২৪০ দিনে সীমিত করার কথা বলা হয়েছিল।

তবে বোস্টনের ইউএস ডিস্ট্রিক্ট জজ এফ ডেনিস সেলার প্রস্তাবিত বিধি কার্যকর হওয়ার আগে এর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। চতুর্থ ট্রেড ইউনিয়ন ও উচ্চশিক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন সংগঠনের জোটের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এই আদেশ দেন।

বিচারক সেলার রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও ভিসা ব্যবস্থায় জালিয়াতি প্রতিরোধ ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ডিএইচএসের দেওয়া যুক্তিকে যথেষ্ট শক্তিশালী মনে করেননি। তাঁর মতে, এসব যুক্তির ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল।

আদালত আরও বলেছে, দীর্ঘদিনের ভিসা ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রে কোটি কোটি গবেষক ও শিক্ষাবিদকে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হয়েছে এবং মার্কিন অর্থনীতিও ব্যাপকভাবে লাভবান হয়েছে। এই ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হলে উচ্চশিক্ষা ও অর্থনীতিতে গুরুতর ক্ষতি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিচারক।

প্রস্তাবিত বিধিটি কার্যকর হলে প্রায় ১৬ লাখ এফ ভিসাধারী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এবং প্রায় পাঁচ লাখ জে ভিসাধারী বিনিময় কর্মসূচির অংশগ্রহণকারী এর আওতায় পড়তেন।

ভিসা বিধি নিয়ে আদালতের আদেশের পাশাপাশি অভিবাসীদের গ্রিন কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রেও ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন উদ্যোগ আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

সোমবার ম্যানহাটনের একটি ফেডারেল আদালতে এ বিষয়ে দুটি পৃথক মামলা করা হয়। ২২টি অঙ্গরাজ্য ও ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ার জোট একটি মামলা করেছে। নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া ও ইলিনয় এ উদ্যোগে নেতৃত্ব দিচ্ছে। একই বিধির বিরুদ্ধে ছয়টি শহর ও কাউন্টিও পৃথক মামলা করেছে।

মামলাগুলোর মূল লক্ষ্য ডিএইচএসের এমন একটি নতুন বিধি কার্যকর হওয়া ঠেকানো, যা শুক্রবার থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন নিয়মে কোন অভিবাসীকে ‘পাবলিক চার্জ’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে, সেই পরিধি আরও বিস্তৃত করার প্রস্তাব রয়েছে।

‘পাবলিক চার্জ’ বলতে সাধারণত এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যিনি নিজের জীবনধারণের জন্য দীর্ঘমেয়াদে সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন বলে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ মনে করে।


বাইডেন প্রশাসনের সময় গ্রিন কার্ডের আবেদন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নগদ সরকারি সহায়তা বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ ছিল। তবে খাদ্য সহায়তা বা মেডিকেইডের মতো নগদ নয় এমন সরকারি সুবিধা গ্রহণ করাকে সাধারণভাবে গ্রিন কার্ডের যোগ্যতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতো না।

ট্রাম্প প্রশাসন এখন তাঁর প্রথম মেয়াদের কঠোর নীতির আদলে নতুন বিধি কার্যকর করতে চাইছে। এতে খাদ্য সহায়তা ও মেডিকেইডসহ কিছু নগদ নয় এমন সরকারি সুবিধা গ্রহণকেও গ্রিন কার্ডের আবেদনে নেতিবাচকভাবে বিবেচনা করার সুযোগ তৈরি হবে।

শুধু আবেদনকারী নিজে সরকারি সুবিধা নিয়েছেন কি না, তা নয়, তাঁর পরিবারের সদস্যরা এসব সুবিধা ব্যবহার করেছেন কি না, সেটিও মূল্যায়নের আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে।

ডিএইচএসের এক মুখপাত্র নতুন বিধির পক্ষে অবস্থান নিয়ে মামলাকারী অঙ্গরাজ্যগুলোর নেতাদের সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, এসব নেতা ফেডারেল সরকারের অর্থায়ন হারানোর আশঙ্কা থেকে নীতিটির বিরোধিতা করছেন।

অন্যদিকে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি বলেছেন, নতুন বিধির ফলে অভিবাসী পরিবারগুলো খাবার ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক সহায়তা থেকে দূরে সরে যেতে পারে। তাঁর মতে, বহু বছর ধরে চালু থাকা এসব সরকারি কর্মসূচি থেকে মানুষকে দূরে রাখাই নীতিটির অন্যতম উদ্দেশ্য।

মামলাকারী অঙ্গরাজ্যগুলোর প্রধান যুক্তি হলো, গ্রিন কার্ডের যোগ্যতার মৌলিক মানদণ্ড নির্ধারণের ক্ষমতা কংগ্রেসের। নির্বাহী আদেশ বা প্রশাসনিক বিধির মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন সেই ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করছে বলে তারা অভিযোগ করেছে।

তাদের দাবি, খাদ্য সহায়তা ও মেডিকেইডের মতো বৈধ সরকারি সুবিধা ব্যবহার করাকে গ্রিন কার্ডের আবেদনে নেতিবাচক কারণ হিসেবে যুক্ত করা হলে তা ফেডারেল অভিবাসন আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।

ফলে একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ আদালতের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের সময়সীমা নির্ধারণের উদ্যোগ আপাতত আদালতে আটকে গেছে, অন্যদিকে সরকারি সুবিধা গ্রহণকারী অভিবাসীদের গ্রিন কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধও আইনি লড়াইয়ের মুখে পড়েছে।