প্রকাশিত: ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ , ০৬:১৯ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
বাংলাদেশের রাজনীতি আবার এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ অস্থিরতা, আন্দোলন, দমন পীড়ন এবং ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের ভোট নয়, এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণের এক গণ আকাঙ্ক্ষার পরীক্ষা। এই নির্বাচনকে ঘিরে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুই শক্তি, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এবং জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রিক জোট। দুই পক্ষই নিজেদেরকে “পরিবর্তনের বাহক” হিসেবে তুলে ধরছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, জনগণ এখন আর শুধু সরকার বদল চায় না। তারা শাসন পদ্ধতির পরিবর্তন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং নিরাপদ নাগরিক জীবন চায়।
বাংলাদেশের ভোটের ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, জনগণ সাধারণত দুইটি পরিস্থিতিতে বড় ধরনের রায় দেয়। এক, অর্থনৈতিক চাপ অসহনীয় হলে। দুই, রাজনৈতিক দমনচাপা অসহনীয় হলে। বর্তমানে এই দুই বাস্তবতাই একসাথে উপস্থিত। দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি। সব মিলিয়ে ভোটারদের বড় অংশ অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে প্রধান ইস্যু হিসেবে দেখছে। ফলে ভোটার আচরণ এবার আদর্শগত নয় বরং জীবনযাত্রাভিত্তিক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
বিএনপি জোটের শক্তি ঐতিহ্যগতভাবে গ্রামীণ ভোটব্যাংক, প্রশাসনিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। তাদের প্রধান বয়ান “রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও নিরপেক্ষ প্রশাসন।” তাদের সমর্থকরা বিশ্বাস করে, দীর্ঘদিনের ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ভাঙতে হলে একটি বড় রাজনৈতিক দলই প্রয়োজন। তবে বিএনপির সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। জনগণ জানতে চায়, ক্ষমতায় গেলে তারা কীভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করবে, কীভাবে বিচারব্যবস্থাকে স্বাধীন করবে, এবং কীভাবে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করবে। অতীতের শাসনামলের অভিজ্ঞতা অনেক ভোটারকে দ্বিধায় রাখে। তারা পরিবর্তন চায়, কিন্তু পুরনো পুনরাবৃত্তি চায় না।
অন্যদিকে জামায়াত কেন্দ্রিক জোটের শক্তি ভিন্ন জায়গায়। তাদের সাংগঠনিক কাঠামো, সামাজিক সেবা কার্যক্রম, শিক্ষাব্যবস্থায় প্রভাব এবং নৈতিক রাজনীতির দাবি। এগুলো একটি নির্দিষ্ট ভোটার শ্রেণিকে আকর্ষণ করে। বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত তরুণদের একাংশ “পরিষ্কার ভাবমূর্তি” এবং শৃঙ্খলাকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করছে। কিন্তু তাদের সামনে বড় প্রশ্ন। জাতীয় পর্যায়ের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা। রাষ্ট্র পরিচালনা শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, কূটনীতি ও অর্থনীতির দক্ষ ব্যবস্থাপনাও প্রয়োজন। তাই অনেক ভোটার তাদেরকে সম্ভাবনা হিসেবে দেখলেও সম্পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত।
এই নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর নারী ও তরুণ ভোটার। বাংলাদেশে মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ। অতীতে নারী ভোটাররা পারিবারিক সিদ্ধান্তের প্রভাবাধীন থাকলেও বর্তমানে তারা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। নিরাপত্তা, দ্রব্যমূল্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা। এগুলো এখন নারী ভোটের প্রধান ইস্যু। তরুণ ভোটারদের ইস্যু ভিন্ন। কর্মসংস্থান, দুর্নীতি, ডিজিটাল স্বাধীনতা, যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি এবং বিদেশে যাওয়ার বিকল্প কমে যাওয়া। কোনো দল যদি এই দুই শ্রেণির বাস্তব সমস্যার কার্যকর সমাধান দেখাতে পারে, তারাই বড় সুবিধা পাবে।
সম্ভাবনার পাশাপাশি আশঙ্কাও আছে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো অবিশ্বাস। দীর্ঘদিনের সংঘাতময় রাজনীতি জনগণকে শিখিয়েছে, নির্বাচন মানেই সংঘর্ষ। যদি ভোটের আগে সহিংসতা বাড়ে, তবে ভোটার উপস্থিতি কমবে এবং ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আবার প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত না হলে বিজয়ী দলও স্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পাবে না। কারণ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গ্রহণযোগ্যতা এখন অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বিনিয়োগ, রপ্তানি, ঋণ, সবই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল।
এই মুহূর্তে বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ বলছে, এককভাবে কোনো দল বিপুল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা কম বরং জোট সরকার বা ক্ষমতা ভাগাভাগির রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা বেশি। অর্থাৎ আগামী পাঁচ বছরের সরকার শুধু ভোটের ফল নয়, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক আচরণের ওপরও নির্ভর করবে। যে পক্ষ পরাজিত হয়েও গণতান্ত্রিক আচরণ করবে এবং যে পক্ষ বিজয়ী হয়েও প্রতিহিংসা এড়িয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন দেবে—তারাই দীর্ঘস্থায়ী হবে।
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভোট। গণতন্ত্রের শক্তি বন্দুক নয়, ব্যালট। একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন কেবল একটি সরকার গঠন করে না; এটি রাষ্ট্রের বৈধতা সৃষ্টি করে। তাই সব দল, কর্মী সমর্থক ও ভোটারদের প্রতি আহ্বান: সংযম রাখুন, সহিংসতা এড়িয়ে চলুন, ভোটকেন্দ্রকে যুদ্ধক্ষেত্র বানাবেন না। মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু রাষ্ট্র সবার। ভোট দিন আপনার বিবেক অনুযায়ী, কিন্তু অন্যের ভোটাধিকারকে সম্মান করুন। কারণ আগামী পাঁচ বছরের সরকার শুধু কোনো দলের হবে না, সেটি হবে ১৮ কোটি মানুষের ভাগ্যের সরকার।