প্রকাশিত: ২৭ জানুয়ারী ২০২৬ , ০৯:১২ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

অভ্যুত্থানের পর নির্বাচন, না কি পুরনো ফাঁদের পুনরাবৃত্তি

বাংলাদেশ ইতিহাসের এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ভুল সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রকে আবারও কয়েক দশক পেছনে ঠেলে দিতে পারে, আর সঠিক সিদ্ধান্ত দেশকে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের পথে এগিয়ে নিতে পারে। জুলাই'২৪ এর ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি সরকারের পতন ঘটায়নি এটি পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের নৈতিক বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই অভ্যুত্থানের পর যে প্রথম নির্বাচন আসছে, সেটি কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়, এটি হবে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রাথমিক পরীক্ষামঞ্চ।

কিন্তু অভ্যুত্থানের ধাক্কা সামলে পুরনো শক্তিগুলো ইতিমধ্যে সক্রিয়। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রকে ব্যক্তিগত সম্পদে রূপান্তর করা রাজনীতি ব্যবসায়িকদের একটি বড় অংশ নতুন করে মাঠে নেমেছে। মুখে সংস্কারের কথা, অন্তরে পুরনো লেনদেন। একসময় যারা ভোটকে পণ্য বানিয়েছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় অফিসে পরিণত করেছে, আজ তারাই আবার 'স্থিতিশীলতা' ও 'অভিজ্ঞতা'র বুলি আওড়াচ্ছে। ইতিহাস বলে, এই শব্দগুলোর আড়ালেই জন্ম নেয় নতুন স্বৈরতন্ত্র।

জুলাই অভ্যুত্থান এই মিথ ভেঙে দিয়েছে যে জনগণ কেবল দর্শক। ছাত্রদের নেতৃত্বে যে জনস্রোত রাজপথে নেমেছিল, তারা দেখিয়েছে নৈতিক শক্তি সংগঠিত হলে রাষ্ট্রীয় দমনযন্ত্রও অকার্যকর হয়ে পড়ে। কিন্তু বিপ্লবের চেয়ে বিপ্লব পরবর্তী সময় বেশি বিপজ্জনক। কারণ তখনই পুরনো শক্তি নতুন পোশাকে ফিরে আসে, গণতন্ত্রের ভাষা ব্যবহার করে গণতন্ত্রকেই হত্যা করতে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রস্তাব ও নির্বাচন আয়োজন তাই কেবল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয় এটি রাজনৈতিক নৈতিকতার প্রশ্ন। প্রশ্ন হলো, এই নির্বাচন কি সত্যিই সৎ, যোগ্য ও নীতিবান মানুষের জন্য মাঠ উন্মুক্ত করবে, নাকি টাকার জোরে, কালো পেশিশক্তিতে এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পুরনো মুখগুলোই আবার সংসদ দখল করবে?

বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো, সৎ মানুষকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা এবং অসৎ মানুষকে 'বাস্তববাদী' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এই সংস্কৃতি ভাঙা না গেলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না। রাষ্ট্রকে যারা ব্যবসার মতো চালাতে চায়, তাদের হাতে রাষ্ট্র গেলে ফলাফল কী হয় তা গত দেড় দশক দেশ দেখেছে।

এই মুহূর্তে দায়িত্ব কেবল সরকারের নয়, নাগরিক সমাজ, লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ এবং সচেতন জনগণেরও। সৎ লোকের পক্ষে বয়ান তৈরি করা এখন কোনো নৈতিক বিলাসিতা নয় এটি রাষ্ট্র বাঁচানোর শর্ত। যে রাজনীতি নীতি ও নৈতিকতাকে দুর্বলতা মনে করে, সে রাজনীতি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে।

এই নির্বাচন যদি আবারও পুরনো ধ্যানধারণার স্বার্থপর, লোভী ব্যবসায়িক রাজনীতিকদের হাতে বন্দি হয়, তবে জুলাই অভ্যুত্থান ইতিহাসের আরেকটি অপচয় হিসেবে চিহ্নিত হবে। আর যদি জনগণ সচেতনভাবে সৎ নেতৃত্বকে সামনে আনে, তবে এই নির্বাচনই হতে পারে স্বাধীনতার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট।

বাংলাদেশ আজ দ্বিতীয় সুযোগ পেয়েছে। ইতিহাস এত উদার হয় না। এই সুযোগ হারালে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষমা করবে না।

এটি কেবল নির্বাচন নয়, এটি একটি জাতির নৈতিক আত্মপরীক্ষা।