প্রকাশিত: ০১ আগষ্ট ২০২৬ , ১২:০৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
বিশ্বকাপ ও অন্যান্য শীর্ষ ফুটবল টুর্নামেন্টে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে এসেছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। সদস্যদেশগুলোর তীব্র বিরোধিতা, আইনি পদক্ষেপের হুমকি এবং সংস্থার অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে শনিবার এই সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।
ফিফার প্রস্তাব অনুযায়ী, বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপসহ সংস্থার প্রধান প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য 'ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই)' নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা ছিল। প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার মূল্যায়নের এই প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ শেয়ার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে ৪২০ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। ফিফার দাবি ছিল, এই অর্থ সদস্যদেশগুলোর উন্নয়ন তহবিলে ব্যয় করা হবে।
পরিকল্পনাটি প্রথম প্রকাশ্যে আসে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস-এর এক প্রতিবেদনের মাধ্যমে। সেখানে অভিযোগ করা হয়, বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব ঘিরে গোপনে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ চুক্তির চেষ্টা চালাচ্ছে ফিফা। প্রতিবেদন প্রকাশের পরই বিশ্ব ফুটবলে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
এরপর ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে পরিকল্পনার কথা স্বীকার করে জানায়, এটি কেবল সীমিত পরিসরে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রির উদ্যোগ। প্রস্তাব অনুমোদিত হলে ২০২৭ সালের শুরুতে প্রতিটি সদস্যদেশকে এককালীন ২ কোটি ডলার দেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে সেই সহায়তা ৪ কোটি ডলার পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে বলেও জানানো হয়।
তবে এই ঘোষণার পর থেকেই ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা UEFA তীব্র আপত্তি জানায়। তাদের অভিযোগ, ফিফা ‘ফুটবলের আত্মা’ বাণিজ্যিক স্বার্থে বিক্রি করতে চাইছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেয় সংস্থাটি। উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনক্যাকাফ, ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবং Asian Football Confederation-ও পরিকল্পনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রীড়াবিষয়ক কমিশনার গ্লেন মিকালিফ খেলাধুলাকে বিনিয়োগের পণ্যে পরিণত না করার আহ্বান জানান।
বিতর্কের মধ্যেই ফিফা সদস্যদেশগুলোর কাছে ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রস্তাব অনুমোদনের আহ্বান জানায়। ইনফান্তিনো এটিকে ‘সুযোগ, বাধ্যবাধকতা নয়’ বলে ব্যাখ্যা দিলেও বিরোধিতা আরও তীব্র হয়। উয়েফা ও তাদের ৫৫ সদস্যদেশ পরিকল্পনা প্রত্যাহার না করলে বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকি দেয়। আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায় এবং কনক্যাকাফের ৪১ সদস্যদেশ সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে।
চাপ আরও বাড়ে যখন ইনফান্তিনোর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও মার্কিন ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি কার্লোস কর্ডেইরো পদত্যাগ করেন। তিনি বলেন, এই পরিকল্পনা ফিফা, সদস্যদেশ এবং বিশ্ব ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। পরে ফিফার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা কেভিন লামুরও জানান, এটি সংস্থার সম্মিলিত উদ্যোগ নয়; বরং ব্যক্তিকেন্দ্রিক একটি প্রকল্প, যা নিয়ে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত বাড়তে থাকা সমালোচনা, অভ্যন্তরীণ চাপ এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের রাজনৈতিক সমীকরণ বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনাটি বাতিল করে ফিফা।
সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় ইনফান্তিনো বলেন, “সবার মতামত গভীরভাবে পর্যালোচনা করার পর আমরা বুঝেছি, এই প্রকল্প অপ্রয়োজনীয় বিভাজন সৃষ্টি করছে এবং আমাদের মূল লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক নয়। তাই এটি আর এগিয়ে নেওয়া হবে না।”
এর ফলে মাত্র কয়েক দিনের বিতর্কের পর বিশ্বকাপসহ ফিফার প্রধান টুর্নামেন্টে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল।