প্রকাশিত: ২০ জুলাই ২০২৬ , ১২:০৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছে স্পেন। নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট পরে লা রোহারা। অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয় লড়াই শেষে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলেই নিশ্চিত হয় স্পেনের বিশ্বজয়।
ফাইনালের আগে নিউইয়র্ক ও নিউজার্সিজুড়ে ছিল আর্জেন্টাইন সমর্থকদের উন্মাদনা। গ্যালারিতেও ছিল তাদের সংখ্যাগত আধিপত্য। কিন্তু মাঠের খেলায় শুরু থেকেই আধিপত্য বিস্তার করে স্পেন। বলের দখল, পাসিং, প্রেসিং এবং আক্রমণে এগিয়ে থেকেও নির্ধারিত ৯০ মিনিটে গোলের দেখা পাচ্ছিল না তারা। এর প্রধান কারণ ছিলেন আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেস। একের পর এক দুর্দান্ত সেভে দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন তিনি।
ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকেই নিজেদের পরিচিত পাসিং ফুটবলে আর্জেন্টিনাকে চাপে রাখে স্পেন। লামিন ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস ও ফেরান তোরেসদের গতিময় আক্রমণে বারবার নড়বড়ে হয়ে পড়ে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ। এমনকি স্পেনের উচ্চ প্রেসিংয়ের কারণে গোলরক্ষক উনাই সিমনকেও মাঝেমধ্যে মধ্যমাঠের কাছাকাছি অবস্থান নিতে দেখা যায়।
স্পেনের আক্রমণের জবাবে শুরু থেকেই লো ব্লকে খেলার কৌশল নেয় আর্জেন্টিনা। সুযোগ পেলেই প্রতি-আক্রমণে ওঠার পরিকল্পনা ছিল তাদের। তবে পুরো ম্যাচেই স্প্যানিশদের নিয়ন্ত্রিত ফুটবলের সামনে নিজেদের ছন্দ খুঁজে পেতে হিমশিম খেতে হয় বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের।
লিওনেল মেসিকেও প্রায় পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে রাখতে সফল হন স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা অধিনায়ক মাত্র ১৫ বার বল স্পর্শ করেন। ম্যাচজুড়েই মেসির কাছে বল পৌঁছানো কঠিন করে তোলে স্পেনের মাঝমাঠ ও রক্ষণভাগ। ফলে তাঁর জাদুকরী মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকা আর্জেন্টাইন সমর্থকদের ফিরতে হয়েছে হতাশ হয়ে।
ম্যাচের শেষ দিকে এসে আরও বড় বিপদে পড়ে আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে স্পেনের ডিফেন্ডার পাউ কুবারসিকে ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন মিডফিল্ডার এনসো ফার্নান্দেস। ১০ জনের দলে পরিণত হওয়ার পর আর্জেন্টিনা আরও বেশি রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ে।
অতিরিক্ত সময়ের প্রথম ভাগে গোলের দেখা পেয়েও তা উদ্যাপন করতে পারেনি স্পেন। নিকো উইলিয়ামসের করা গোলটি ভিএআর পর্যালোচনায় বাতিল হয়, কারণ আক্রমণ শুরুর আগে মিকেল মেরিনোর ফাউলের প্রমাণ মেলে। তবে এতে দমে যায়নি স্প্যানিশরা।
বিরতি শেষে আবারও আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা। শেষ পর্যন্ত নিকো উইলিয়ামসের হেড থেকে পাওয়া বলে ফেরান তোরেসের বুলেট গতির শটে ভেঙে যায় মার্তিনেসের অদম্য প্রতিরোধ। ১০৬ মিনিটে করা সেই গোলই হয়ে ওঠে বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী মুহূর্ত। ২০১০ বিশ্বকাপ ফাইনালে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার অতিরিক্ত সময়ের জয়সূচক গোলের স্মৃতিও যেন ফিরে আসে সেই মুহূর্তে।
গোল হজমের পরও শেষ চেষ্টা করেছিল আর্জেন্টিনা। গ্যালারিতে থাকা সমর্থকেরাও শেষ পর্যন্ত কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে দলকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু সুসংগঠিত ও আত্মবিশ্বাসী স্পেনের বিপক্ষে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি তারা।
পুরো বিশ্বকাপজুড়ে দুর্দান্ত ফুটবল খেলা স্পেন ফাইনালেও ছিল সেরা দল। তাদের ধারাবাহিকতা, আক্রমণভাগের গতি এবং কৌশলগত শৃঙ্খলার সামনে অসহায় দেখিয়েছে আর্জেন্টিনাকে। তাই ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে তুলে নেওয়াটা যেন তাদের প্রাপ্যই ছিল।
অন্যদিকে, মেটলাইফ স্টেডিয়াম আবারও বেদনার স্মৃতি হয়ে রইল লিওনেল মেসির জন্য। ২০১৬ সালে এই মাঠেই কোপা আমেরিকার ফাইনাল হেরে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। পরে ফিরে এসে জিতেছেন বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকাসহ অসংখ্য শিরোপা। কিন্তু এবার বিশ্বকাপের ফাইনালে পরাজয় যেন তাঁর বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে আরেকটি বিষণ্ণ স্মৃতি হয়ে থাকল।
আর স্পেনের জন্য? এটি শুধু একটি বিশ্বকাপ জয় নয়, বরং নতুন প্রজন্মের হাত ধরে বিশ্ব ফুটবলে স্প্যানিশ আধিপত্যের প্রত্যাবর্তনের ঘোষণাও।