প্রকাশিত: ০৯ আগষ্ট ২০২৬ , ১১:৪৯ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
ইরানের সঙ্গে ছয় মাস ধরে চলমান তীব্র সামরিক সংঘাত ও হাই-প্রোফাইল সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (Operation Epic Fury)-র পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ভাণ্ডারে গুরুতর অস্ত্র ও গোলাবারুদ ঘাটতির খবর ছড়িয়ে পড়েছে। এই খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনসহ ওয়াশিংটনের নীতি-নির্ধারকদের মাঝে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। হোয়াইট হাউস ও প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন এখন প্রকাশ্যে। পেন্টাগন যেখানে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের মুখে কৌশলগত অস্ত্রের মজুদ নিঃশেষ হওয়ার ঝুঁকিতে চিন্তিত, সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। কেবল তা-ই নয়, মার্কিন অস্ত্রাগারের কৌশলগত তথ্য গণমাধ্যমে ফাঁস করার ঘটনাকে "দেশদ্রোহী পদক্ষেপ" আখ্যা দিয়ে জড়িতদের দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ডের কঠোর হুঙ্কার দিয়েছেন তিনি।
তবে মূলধারার গণমাধ্যম, স্বাধীন সামরিক গবেষণা সংস্থা এবং গোয়েন্দা উপাত্তের গভীর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক আশঙ্কাজনক চিত্র। চার হাজার কোটি ডলারেরও (৪০ বিলিয়ন ডলার) বেশি অর্থ ব্যয় এবং বিশাল পরিমাণ উন্নতমানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের পর এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, ওয়াশিংটন কেবল একটি অনির্দিষ্ট যুদ্ধের চক্রে আটকা পড়েনি, বরং নিজেদের ভবিষ্যৎ কৌশলগত নিরাপত্তাকেও মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।
অস্ত্রাগারের বাস্তবতা ও তথ্য ফাঁসে ট্রাম্পের রুদ্ররূপ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন অস্ত্রাগার খালি হওয়ার খবরকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, "যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পর্যাপ্ত এবং বিশেষ কিছু ক্যাটাগরির বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুদ রয়েছে। এছাড়া চাহিদা অনুযায়ী জরুরি ভিত্তিতে নতুন অস্ত্র তৈরি ও সরবরাহ অব্যাহত আছে।"
পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ আলোচনার তথ্য কীভাবে সংবাদমাধ্যমে পৌঁছাল, তা নিয়ে ট্রাম্পের ক্ষোভ চরম আকার ধারণ করেছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "এই জাতীয় গোপন তথ্য ফাঁসের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দ্রুত চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড নিশ্চিত করা হবে।" মার্কিন প্রভাবশালী দৈনিক 'ওয়াশিংটন পোস্ট'-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের তীব্র সমালোচনা করে ট্রাম্প এটিকে "ভুয়া ও দেশদ্রোহী সাংবাদিকতা" বলে অভিহিত করেন। উক্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, অস্ত্রের ঘাটতি সংক্রান্ত তথ্য গোপন রাখা এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণে ট্রাম্প স্বয়ং প্রতিরক্ষা সচিব (ডিপার্টমেন্ট অব ডিফেন্স সেক্রেটারি) পিট হেগসেথের ওপর চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। ট্রাম্প এই দাবি সম্পূর্ণ খণ্ডন করে বলেন যে, হেগসেথ পেন্টাগন পরিচালনায় চমৎকার কাজ করছেন এবং তাঁর ওপর প্রশাসনিক পূর্ণ আস্থা রয়েছে।
প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথও সংবাদমাধ্যমের এই দাবিকে "বানানো গল্প" বা 'ম্যানুফ্যাকচার্ড স্টোরি' বলে অভিহিত করেছেন। সিবিএস-এর 'ফেস দ্য নেশন' অনুষ্ঠানে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, মার্কিন বাহিনীর কাছে শত্রুর যে কোনো চক্রান্ত নস্যাৎ করার মতো পর্যপ্ত সরঞ্জাম রয়েছে। তা সত্ত্বেও, পেন্টাগন সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসের কাছে জরুরি সামরিক সহায়তা তহবিল হিসেবে ৮৭ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ চেয়েছে, যার একটি বড় অংশ খরচ করা হবে ক্ষয়ে যাওয়া সামরিক সরঞ্জাম ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ দ্রুত পুনঃউৎপাদনে (rapid replenishment)।
গোয়েন্দা উপাত্ত ও গবেষণায় অস্ত্র সংকটের বাস্তব চিত্র
হোয়াইট হাউস থেকে আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য দেওয়া হলেও বিভিন্ন স্বাধীন সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের উপাত্তে ভিন্ন চিত্র স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মজুদসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য ক্লাসিফাইড বা অত্যন্ত গোপনীয় হলেও সাধারণ ডেটা বিশ্লেষণ করে চাঞ্চল্যকর তথ্য উপস্থাপন করেছে ওয়াশিংটনভিত্তিক বিখ্যাত থিঙ্ক ট্যাঙ্ক 'সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ' (CSIS)।
প্যাট্রিয়ট (Patriot) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা: CSIS-এর প্রবীণ সামরিক বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কোর কর্নেল মার্ক ক্যানসিয়ানের হিসাব অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে প্রায় ২,৩৩০টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। কিন্তু সংঘাতের মাত্র ছয় মাসের মাথায় সেই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৫৯ থেকে ৮২৭টিতে। অর্থাৎ, মার্কিন বাহিনীর মোট প্যাট্রিয়ট মজুদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বা ৬০%-৭০% ইতিমধ্যে ব্যবহৃত হয়ে গেছে।
থাড (THAAD) ক্ষেপণাস্ত্রের অভাব: উচ্চ বাগে আসা ব্যালেস্টিক মিসাইল ধ্বংস করতে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি 'টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স' (THAAD)। পরিসংখ্যান বলছে, থাড ব্যবস্থার জন্য সংরক্ষিত ইন্টারসেপ্টরগুলোর প্রায় ৬০ শতাংশই ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ রক্ষায় উৎক্ষেপণ করা হয়েছে।
টমাহক ও দূরপাল্লার ক্রুজ মিসাইল: নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং সিএনএন-এর যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত ১,০০০টিরও বেশি 'টমাহক' (Tomahawk) ক্রুজ মিসাইল ফায়ার করেছে—যা পেন্টাগনের বার্ষিক ক্রুজ মিসাইল ক্রয়ের হারের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি। এছাড়া, চীন ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য বৃহৎ যুদ্ধের জন্য সংরক্ষিত ১,১০০টির মতো দূরপাল্লার স্টিল্থ ক্রুজ মিসাইলের একটি বড় অংশ এই ছয় মাসের লড়াইয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে।
সারফেস-টু-সারফেস কৌশলগত মিসাইল: রয়টার্সের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মার্কিন স্থলবাহিনী তাদের কাছে থাকা সারফেস-টু-সারফেস 'আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম' (ATACMS) এবং নতুন 'প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল' (PrSM)-এর প্রায় ৮০ শতাংশই ব্যবহার করে ফেলেছে, যা মার্কিন পদাতিক বাহিনীর ভবিষ্যৎ সক্ষমতাকে সীমিত করে দিচ্ছে।
তেহরানের তোপ: "আমদানিকৃত প্রযুক্তির পতন ও দেশীয় শক্তির জয়"
মার্কিন অস্ত্রাগারে টান পড়ার খবরে স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাসের সুর দেখা গেছে তেহরানের নীতি-নির্ধারকদের কণ্ঠে। ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মার্কিন প্রতিবেদনগুলোকে নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলের জয় হিসেবে উপস্থাপন করছে।
ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মজিদ ইবনে-রেজা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ক্ষয় নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করেছেন। তিনি লেখেন:
"প্রতিদিনই শত্রুর ক্ষয়িষ্ণু সামরিক সক্ষমতার প্রমাণ আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী দেশীয় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পের ওপর ভর করে যে কোনো বহিরাগত হুমকি মোকাবেলায় পুরোপুরি সক্ষম ও প্রস্তুত।"
ইবনে-রেজা যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের পরোক্ষ ইঙ্গিত করে আরও বলেন, "যারা মধ্যপ্রাচ্যে বিদেশ থেকে অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আমদানি করে নিরাপত্তা ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব কিনতে চেয়েছিল, তারা এখন তিতকুটে সত্যের মুখোমুখি। তারা খুব শীঘ্রই অনুধাবন করবে যে ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি প্রতিরক্ষা অবকাঠামো এই অঞ্চলের আমদানিকৃত যে কোনো সামরিক ব্যবস্থার চেয়ে বহুগুণে শক্তিশালী ও টেকসই।"
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ড্রোন এবং সস্তা ব্যালেস্টিক মিসাইল ব্যবহার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোটি কোটি ডলার মূল্যের ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর মিসাইলগুলোকে শেষ করার একটি 'অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার' বা অসম যুদ্ধনীতি গ্রহণ করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে ক্লান্ত করে ফেলছে।
ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ: বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও সংকটের সুদূরপ্রসারী প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত কেবল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর ফলে বিশ্বরাজনীতি ও নিরাপত্তার সার্বিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে।
১. ইউক্রেন সংঘাত ও ইউরো-অ্যাটলান্টিক নিরাপত্তা:
রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অতিরিক্ত 'প্যাট্রিয়ট' মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম ও গোলাবারুদের জন্য আকুতি জানিয়ে আসছে। কিয়েভের আকাশ রক্ষায় এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের মজুদ আশঙ্কাজনক মাত্রায় নেমে আসায় ওয়াশিংটন এখন ইউক্রেনকে নতুন করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন যে, ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট মিসাইল দেওয়া এখন ওয়াশিংটনের জন্য একটি "অত্যন্ত কঠিন ও বড় সিদ্ধান্ত", কারণ নিজেদের নিরাপত্তার জন্য এগুলো ধরে রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে।
২. তাইওয়ান ও চীন মোকাবিলার ছক ওলটপালট:
পেন্টাগনের সামরিক পরিকল্পনাবিদদের দীর্ঘমেয়াদী মনোযোগ ছিল ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের সামরিক প্রভাব ঠেকানো। কিন্তু 'অপারেশন এপিক ফিউরি'-তে চীন কেন্দ্রিক যুদ্ধের জন্য রাখা স্টিল্থ ক্রুজ মিসাইল ও অন্যান্য প্রিসিশন-গাইডেড অস্ত্র বিপুল পরিমাণে ব্যবহৃত হওয়ায় বেইজিংকে প্রতিরোধ করার মার্কিন সামর্থ্য এক বড় ধাক্কা খেয়েছে।
৩. অস্ত্র উৎপাদনের ধীরগতি ও শিল্প কাঠামোর সীমাবদ্ধতা:
আধুনিক সামরিক প্রযুক্তির জটিলতার কারণে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র চাইলেই দ্রুত তৈরি করা সম্ভব নয়। পেন্টাগন ও প্রতিরক্ষা কনট্রাক্টরদের (যেমন লকাড মার্টিন বা রায়থিয়ন) একটি প্রিসিশন গাইড মিসাইল তৈরি করতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ, সংযোজন এবং গুণগত পরীক্ষা সম্পন্ন করতে অন্তত ১৮ থেকে ২৪ মাস সময় লাগে। ফলে জরুরি অর্থ বরাদ্দ পেলেও মার্কিন অস্ত্রাগার পূর্বের অবস্থায় ফেরাতে কয়েক বছর সময় লেগে যাবে।
রাজনৈতিক স্যাটায়ার ও অভ্যন্তরীণ সমালোচনা: অস্ত্রহীন যুদ্ধের ব্যঙ্গাত্মক রূপ
সংকট যখন তীব্র, তখন মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে কৌতুক, বিদ্রূপ ও তীব্র অসন্তোষ। আমেরিকান রাজনৈতিক কলামিস্ট ও বিশ্লেষকদের একটি অংশ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রশাসনিক একগুয়েমিকে ব্যঙ্গাত্মক বা স্যাটায়ারিক্যাল ভঙ্গিতে ফুটিয়ে তুলছেন।
যদি সত্যি পেন্টাগনের ক্ষেপণাস্ত্রের ঝুড়ি ফাঁকা হয়ে যায়, তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী কীভাবে এই যুদ্ধ টেনে নিয়ে যাবে? কলামিস্টদের কলমে উঠে এসেছে কিছু তীব্র বিদ্রূপাত্মক সমাধান:
লিংকন মেমোরিয়াল পুলের খসে পড়া প্রলেপ: ওয়াশিংটনের ঐতিহ্যবাহী লিংকন মেমোরিয়াল রিফ্লেক্টিং পুলের সংস্কার কাজে ব্যবহৃত আবরণ বা প্রলেপ (Rhino 406 ও Pipeliner 5000) জলবায়ু ও পানির চাপ সহ্য করতে না পেরে খসে পড়ছে। কলামিস্টদের কটাক্ষ—যুক্তরাষ্ট্রের এখন এই খসে পড়া শক্ত প্লাস্টিক ও কংক্রিটের টুকরোগুলো বোমারু বিমানে করে ইরানের ওপর ফেলা ছাড়া উপায় নেই!
ট্রাম্প ব্র্যান্ডের হাজারো মার্চেন্ডাইজ: ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যিক শপগুলোতে বিক্রি হওয়া 'ট্রাম্প' ব্র্যান্ডের গলফ বল, সুগন্ধি মোমবাতি, স্টেইনলেস স্টিলের ট্রাম্প-ইয়েটি ওয়াটার বোটল কিংবা পিকলবল র্যাকেট কৌশলগত সামরিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবস্থার প্রস্তাব করা হচ্ছে! আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের জায়গায় ট্রাম্পের মার্চেন্ডাইজের স্তূপ দিয়ে শত্রু পক্ষকে কাবু করার এই বিদ্রূপ প্রশাসনিক অদূরদর্শিতাকেই স্পষ্ট করে।
হোয়াইট হাউসের ইস্ট উইংয়ের ধ্বংসাবশেষ: ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের ঐতিহাসিক 'ইস্ট উইং' ভেঙে নতুন বলরুম নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন। সেই ভাঙা ইটের জঞ্জাল প্রাচীন ক্যাটাপল্ট (গুলতি) যন্ত্রে বসিয়ে তেহরানে নিক্ষেপ করার বিদ্রূপাত্মক পরামর্শ দিয়ে কলামিস্টরা বলছেন, "আমেরিকান গণতন্ত্রের ধ্বংসাবশেষ দিয়ে শত্রুকে আঘাত করার চেয়ে বড় আইরনি আর কী হতে পারে!"
বাজেয়াপ্ত হওয়া প্রাত্যহিক গৃহস্থালী সামগ্রী: যুদ্ধের কারণে মার্কিন অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে রেকর্ড মূল্যস্ফীতি। খাদ্যের খরচ সামলাতে না পেরে বা ব্যাংকের ঋণ শোধ করতে ব্যর্থ হয়ে যে সব সাধারণ আমেরিকান নাগরিক নিজেদের গাড়ি, ফ্রিজ বা ওয়াশিং মেশিন হারিয়েছেন, পেন্টাগন নাকি এবার ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই বাজেয়াপ্ত গৃহস্থালী পণ্যগুলো আকাশ থেকে ছুড়ে মারতে পারে!
জনমতের রায় ও ট্রাম্পের ভাবমূর্তিতে বড় আঘাত
আমেরিকান জনগণের মাঝে এই সংঘাত নিয়ে অসন্তোষ এখন তুঙ্গে। খ্যাতনামা গবেষণা ও জনমত জরিপ সংস্থা 'কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটি' (Quinnipiac University)-র সর্বশেষ সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ৬৬ শতাংশ আমেরিকান নাগরিক স্পষ্ট মনে করেন যে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযান সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় এবং আত্মঘাতী।
আমেরিকান জনসাধারণ যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকটের কবলে পড়ে জীবনযাত্রার মান হারিয়ে ফেলছে, তখন ওয়াশিংটনের রাজনীতিবিদদের শত শত কোটি ডলার অস্ত্রের পেছনে উড়ানো সাধারণ ভোটাররা সহজভাবে নিচ্ছেন না। কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যে "বিশেষ ক্যাটাগরির প্রচুর অস্ত্রের" দাবি করছেন, তা আসলে সামরিক সামর্থ্যের প্রমাণ নয়, বরং অপশাসন ও প্রশাসনিক দূরদর্শিতার অভাব গোপন করার সাময়িক চেষ্টা।
যুদ্ধের ষষ্ঠ মাসে এসে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন এক কঠিন বাস্তব দাঁড়িয়েছে: একদিকে মার্কিন বাহিনীর অস্ত্রের ঘাটতি ও বৈশ্বিক প্রভাব হ্রাসের ঝুঁকি, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চাপ। এই পরিস্থিতি থেকে ট্রাম্প প্রশাসন কীভাবে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসবে, কিংবা সামরিক শক্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে—তার ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্য তথা সমগ্র বিশ্বের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা।