ভাষা নির্বাচন / Select Language
  • 🇧🇩
    বাংলা মূল ভাষা (Original)
  • 🇺🇸
    English English
প্রকাশিত: ২১ অক্টোবার ২০২৬, ০৯:৪৮ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

হুথিদের ক্রমবর্ধমান শক্তিতে চাপে সৌদি আরব, নেপথ্যে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি

হুথিদের ক্রমবর্ধমান শক্তিতে চাপে সৌদি আরব, নেপথ্যে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি

ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন ও সৌদি আরবের দ্বন্দ্ব মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল নিরাপত্তা সংকটগুলোর একটি। ২০২৬ সালের অক্টোবরে এসে সংঘাতটি নতুন ও আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। রিয়াদের বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত ও আরো বহু মানুষ আহত হওয়ার খবর রয়েছে। তবে হামলার সফলতা নিয়ে হুথিদের সব দাবি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। একটি বিষয় স্পষ্ট: হুথিরা এখন আর শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহী গোষ্ঠী নয়, তারা আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যের অংশ। এখানে প্রশ্ন হলো, আধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রের জন্য হুথিরা কীভাবে বড় নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠছে? এর উত্তর খুঁজতে ইয়েমেনের রাজনীতি, সৌদি-ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি একসঙ্গে বুঝতে হবে। হুথিদের আনুষ্ঠানিক নাম আনসারুল্লাহ। ১৯৯০-এর দশকে উত্তর ইয়েমেনের জায়েদি শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে তাদের যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুথির নাম থেকেই ‘হুথি’ পরিচয়ের উৎপত্তি। শুরুতে আন্দোলনটির মূল ক্ষোভ ছিল রাজনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে। ২০১১ সালের আরব বসন্তের পর অস্থিরতা বাড়ে। ২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করলে দেশটি পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার এডেনে গিয়ে অবস্থান নেয়।

২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে এবং নৌ-অবরোধ আরোপ করে। রিয়াদের যুক্তি ছিল, ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বৃদ্ধি তার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। হুথিরা এই অভিযানকে বিদেশি আগ্রাসন হিসেবে দেখে, অন্যদিকে সৌদি আরব তাদের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি মনে করে। এই সংঘাতের পেছনে সৌদি আরব ও ইরানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুথিদের যোদ্ধার সংখ্যা ২০১৫ সালের প্রায় ৩০ হাজার থেকে বেড়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার পর্যন্ত হয়েছে। একসময় গেরিলা যুদ্ধে সীমাবদ্ধ গোষ্ঠীটি এখন দূরপাল্লার হামলা চালাতে সক্ষম। তাদের অস্ত্রভান্ডারে রয়েছে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, আত্মঘাতী ড্রোন এবং বিস্ফোরকবাহী নৌযান। ২০১৯ সালে সৌদি আরবের আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় হামলা দেখিয়েছিল, কীভাবে তুলনামূলক কম খরচের অস্ত্র ব্যবহার করে দেশটির তেল উৎপাদনের বড় অংশ সাময়িকভাবে অচল করে দেওয়া যায়। হামলার দায় হুথিরা স্বীকার করলেও সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র ইরান-সমর্থিত শক্তিকে দায়ী করেছিল।

সৌদি আরবের যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক কম খরচের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও চাপে পড়ে। স্বল্পমূল্যের ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে প্রতিরক্ষাকারী পক্ষকে অনেক বেশি ব্যয়বহুল প্রতিরোধক ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হতে পারে। এটিই অসম যুদ্ধের মূল সমীকরণ। এ ছাড়া বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় যোদ্ধা ও সামরিক অবকাঠামো ছড়িয়ে রাখার সুবিধাও হুথিদের রয়েছে।

ইরানের ভূমিকা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, তেহরান হুথিদের অস্ত্র, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। হুথিরা তা অস্বীকার করে নিজেদের সামরিক সক্ষমতার দাবি করে। ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও হুথিরা তেহরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধীন নয়; তাদের নিজস্ব ইয়েমেনকেন্দ্রিক স্বার্থ রয়েছে। তবে ইরানের সহযোগিতা তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

২০২৬ সালের শুরুতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ আঞ্চলিক সমীকরণ বদলে দেয়। হুথিরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। তারা সৌদি-সমর্থিত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালায়। এরপর কাউন্সিলের প্রধান রশাদ আল-আলিমি সানাসহ হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকা পুনরুদ্ধারে ‘অপারেশন ডন অব ইয়েমেন’ ঘোষণা করেন। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানায়, অভিযানে ১০০টি যুদ্ধবিমান অংশ নিয়েছে। ২০২২ সালের পর এটিই ছিল আকাশপথে হামলা পুনরায় শুরুর প্রথম স্বীকৃতি।

হুথিদের জবাব এসেছে সরাসরি সৌদি ভূখণ্ডে। রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলার পর সৌদি আরব কঠোর প্রতিশোধের ঘোষণা দেয়। আরামকোর সদর দপ্তরেও হামলা চালানো হয়। এডেনে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পাঁচজন নিহত হন। তাইজ ঘিরে লড়াইও তীব্র হয়েছে এবং সেপ্টেম্বর থেকে দুই লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। হামলার প্রভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের নির্ধারিত যৌথ শীর্ষ সম্মেলন সৌদি আরবে স্থগিত করা হয়েছে। সৌদি আরব তাদের বড় বিনিয়োগ সম্মেলনেও দূর থেকে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা বিবেচনা করছে বলে খবর রয়েছে। হুথিদের গুরুত্ব শুধু ইয়েমেনের সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়। বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছে তাদের অবস্থান বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যপথের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধের পর তারা লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে। হুথিরা এসব হামলাকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন হিসেবে দাবি করে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সামরিক অভিযানেও তাদের সক্ষমতা পুরোপুরি থামানো যায়নি।

সৌদি আরবের জন্য ঝুঁকি আরও বড়, কারণ দেশটির অর্থনীতি জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে ভিশনভিত্তিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের সাফল্য আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। এ কারণে বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলা সৌদি আরবের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক, উভয় ধরনের চাপ তৈরি করছে।

এই সংঘাতকে ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থায়ও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। এক সৌদি কূটনীতিকের মতে, মতবিরোধের কারণে একসময়ের জোটসঙ্গী সংযুক্ত আরব আমিরাত কয়েক মাস আগে সমর্থন প্রত্যাহার করেছে। অন্যদিকে মক্কা জোট তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সক্রিয় করে দ্রুত সৌদি আরবে সেনা মোতায়েনে সম্মত হয়েছে বলে খবর রয়েছে। হুথিদের শক্তি কেবল অস্ত্রভান্ডারে নয়, তাদের যুদ্ধের ধরন, ভৌগোলিক অবস্থান এবং দীর্ঘদিন সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতার মধ্যেও নিহিত। সৌদি আরবের মতো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক বিজয় অর্জন তাদের মূল লক্ষ্য নয়। তারা কম খরচে হামলা চালিয়ে আলোচনায় নিজেদের দর-কষাকষির শক্তি বাড়াতে চায় এবং সংঘাতের নতুন নিয়ম প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এর মধ্যে রয়েছে হুথি-নিয়ন্ত্রিত বন্দর ও বিমানবন্দরে নিষেধাজ্ঞার জবাবে সৌদি বিমানবন্দরে হামলা চালানো। তাদের প্রধান দাবি অবরোধ প্রত্যাহার। পাশাপাশি ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সমঝোতায় নিজেদের অন্তর্ভুক্তি এবং ভবিষ্যতে আক্রমণ না হওয়ার নিশ্চয়তাও তারা চায়।

সৌদি আরব জুলাইয়ে ওমানে বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু হুথিরা তা প্রত্যাখ্যান করে। ইরানও মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলে সামরিক সমাধানের বিরুদ্ধে সতর্ক করেন এবং সৌদি-হুথি আলোচনায় সহায়তার প্রস্তাব দেন। তবে সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা ইরানের মধ্যস্থতা চায়নি এবং ওমানের মাধ্যমে হুথিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

একজন শীর্ষ সৌদি কূটনীতিক অভিযোগ করেছেন, ইরান হুথিদের হামলা বাড়াতে উৎসাহ দিচ্ছে এবং বেইজিং চুক্তির প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করে তাদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, তেহরান নিজেকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরছে। ২০২৩ সালের খসড়া রোডম্যাপের মতো উদ্যোগও পূর্ণ বাস্তবায়ন পায়নি। মূল জটিলতা হলো, হুথিদের ন্যূনতম দাবি অবরোধ প্রত্যাহার করা, আর অবরোধই সৌদি আরবের প্রধান দর-কষাকষির উপায়। ফলে উভয় পক্ষই নিজেদের ন্যূনতম শর্ত ছাড়তে নারাজ।

এ ছাড়া হুথি সংকট এখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর দর-কষাকষির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। তেহরানের প্রস্তাবিত রোডম্যাপে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের জব্দ সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার মতো শর্ত রয়েছে। এসব বৃহত্তর ইস্যুর সঙ্গে সৌদি-হুথি সংকট জড়িয়ে পড়লে যুদ্ধবিরতি অর্জন আরও কঠিন হতে পারে।

সৌদি-হুথি সংকট প্রমাণ করে যে আধুনিক সংঘাত শুধু প্রচলিত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে মীমাংসা করা যায় না। সস্তা প্রযুক্তি, আঞ্চলিক মিত্রতা এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রকেও কঠিন অবস্থানে ফেলতে পারে। স্থায়ী সমাধানের জন্য সামরিক চাপের পাশাপাশি অবরোধ, বেতন-ভাতা, বন্দর এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা ভাগাভাগির মতো মৌলিক প্রশ্নে বাস্তবসম্মত সমঝোতা প্রয়োজন। তা না হলে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ ও বিশ্ব অর্থনীতি, উভয়কেই এই অনিশ্চয়তার প্রভাব বহন করতে হবে।

লেখক: নির্মাতা ও সংস্কৃতিকর্মী