-
🇧🇩
বাংলা মূল ভাষা (Original)
-
🇺🇸
English English
একজন নারী যখন পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে বিদেশের পথে পা বাড়ান, তখন তাঁর চোখে থাকে সচ্ছল জীবনের প্রত্যাশা, সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের অভাব দূর করার আকাঙ্ক্ষা। নিজের সুখ, পরিচিত পরিবেশ, প্রিয়জনের সান্নিধ্য সবকিছু পেছনে ফেলে তিনি পাড়ি জমান অচেনা দেশে। তাঁর পাঠানো অর্থে পরিবারের ভরণপোষণ চলে, সন্তানের পড়াশোনা এগিয়ে যায়, ঋণের বোঝা কমে, গড়ে ওঠে স্বপ্নের ঘর। দেশের অর্থনীতিতেও যুক্ত হয় বৈদেশিক মুদ্রা। অথচ সেই অর্থ উপার্জন করতে গিয়ে কোনো কোনো নারীকে যে নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, তা আমাদের সামাজিক বিবেক ও রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে যাঁদের শ্রম ও ত্যাগ গুরুত্বপূর্ণ, তাঁদের নিজেদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা কেন আজও অনিশ্চিত?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। এই অবদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নারী শ্রমিকদের শ্রম ও আত্মত্যাগের সঙ্গে যুক্ত। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য উদ্ধৃত করে *দ্য ডেইলি স্টার* ১৮ এপ্রিল ২০২৬-এ জানায়, ২০০৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১২ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি নারী কাজের জন্য বিদেশে গেছেন। তাঁদের প্রধান গন্তব্যের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, লেবানন ও ওমান। এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে অসংখ্য পরিবারের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, নারীর আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চেষ্টা এবং উন্নত ভবিষ্যৎ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু বিদেশে কর্মসংস্থানের এই যাত্রা সবার জন্য সমান নিরাপদ হয়ে উঠছে কি না, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। তাঁদের অনেকেই সীমিত আর্থিক সামর্থ্য, পারিবারিক দায়িত্ব এবং দেশে কর্মসংস্থানের সংকটের কারণে বিদেশে কাজ করতে আগ্রহী হন। দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি, ভালো বেতনের আশ্বাস এবং উন্নত জীবনের স্বপ্ন তাঁদের বিদেশযাত্রায় উৎসাহিত করে। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর পর কারও কারও সামনে উন্মোচিত হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা। চুক্তিতে যে বেতনের কথা বলা হয়, বাস্তবে তা দেওয়া হয় না। মাসের পর মাস কাজ করেও প্রাপ্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হতে হয়। নির্ধারিত কর্মঘণ্টার পরিবর্তে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। বিশ্রাম, পর্যাপ্ত খাবার, চিকিৎসা কিংবা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে। কারও পাসপোর্ট আটকে রাখা হয়, কাউকে কর্মস্থল ছেড়ে বের হতে দেওয়া হয় না। এভাবে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি কখনো কখনো পরিণত হয় শোষণ, বন্দিত্ব ও অসহায়ত্বের অভিজ্ঞতায়।
এই বাস্তবতার একটি দৃষ্টান্ত উঠে এসেছে *দ্য ডেইলি স্টার*-এর ১৮ এপ্রিল ২০২৬-এর প্রতিবেদনে। সেখানে ‘রহিমা’ ছদ্মনামে পরিচিত নরসিংদীর এক নারীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁকে সৌদি আরবে মাসে ১,৪০০ রিয়াল বেতনে অফিসের চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁকে অফিসের পরিবর্তে একটি বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতে হয় এবং বেতনও কমিয়ে দেওয়া হয়। তিনি রাত একটা পর্যন্ত কাজ করা, পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়া এবং বিশ্রামের সুযোগ না থাকার অভিজ্ঞতার কথা জানান। একজন নারী যখন উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে যান, তখন তাঁকে যদি প্রতিশ্রুত কাজের বদলে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, সেটি শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়; এটি নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও শ্রমিক সুরক্ষার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু নারী শ্রমিককে অর্থনৈতিক শোষণের পাশাপাশি যৌন হয়রানি ও যৌন সহিংসতারও শিকার হতে হয়। বিশেষ করে ব্যক্তিগত বাসাবাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করার সময় তাঁরা অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন পরিবেশে থাকেন। সেখানে বাইরের মানুষের নজরদারি, দ্রুত সহায়তা পাওয়া কিংবা নির্যাতনের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর সুযোগ সীমিত হতে পারে। কোনো কোনো অভিযোগে নিয়োগকর্তা বা পরিবারের পুরুষ সদস্যদের দ্বারা অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আচরণ, যৌন নিপীড়ন এবং শারীরিক নির্যাতনের কথা উঠে আসে।
কোনো কোনো নারীকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে বাড়ির পুরুষ সদস্যদের যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে বাবা-ছেলের মতো একাধিক ব্যক্তির দ্বারা যৌন নির্যাতনের অভিযোগও সামনে আসে। এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত গুরুতর এবং প্রতিটি অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যায় না কিন্তু ভুক্তভোগীর বক্তব্যকে অবজ্ঞা করাও ন্যায়সংগত নয়। একজন নারীকে এমন অসহায় পরিস্থিতিতে ফেলে রাখা, যেখানে তাঁর সম্মতি, শরীর ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কোনো মূল্য নেই, তা মানবিক মর্যাদার মৌলিক ধারণাকেই আঘাত করে।
প্রশ্ন হলো, একজন নারী শ্রমিক কি দরিদ্র পরিবারের সদস্য বলেই এমন অবমাননার শিকার হবেন? তাঁর আর্থিক অসচ্ছলতা কি তাঁকে অন্যের ইচ্ছার অধীন করে দেয়? কোনো পরিবারে কাজ করতে যাওয়া মানে কি নিজের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মর্যাদা সমর্পণ করা? নিশ্চয়ই নয়। কাজের চুক্তি একজন শ্রমিকের শ্রমের বিনিময় নির্ধারণ করে; তাঁর শরীরের ওপর কারও মালিকানা প্রতিষ্ঠা করে না। সম্মতি ছাড়া যৌন আচরণ, জবরদস্তি কিংবা শারীরিক নির্যাতন গুরুতর অন্যায়।
সমস্যাটির ব্যাপ্তি বোঝার জন্য দেশে ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের অভিজ্ঞতাও বিবেচনা করা জরুরি। *দ্য ডেইলি স্টার*-এর একই প্রতিবেদনে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০১৯ সাল থেকে অন্তত ৬৯ হাজার ৯০ জন নারী বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। তাঁদের অনেকের অভিজ্ঞতার মধ্যে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, খাবারের অভাব, বকেয়া মজুরি এবং অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার বিষয় উঠে এসেছে। এই সংখ্যার অর্থ এই নয় যে দেশে ফেরা প্রত্যেক নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন; বরং এটি প্রত্যাবর্তনকারী নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা, সহায়তা ও পুনর্বাসন নিয়ে গভীরভাবে অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নারী অভিবাসী শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বিএমইটিতে ২,০৩৬টি অভিযোগ জমা পড়েছিল বলে *দ্য ডেইলি স্টার* জানিয়েছে। একই প্রতিবেদনে মজুরি না পাওয়া, শারীরিক ও যৌন নির্যাতন এবং শ্রমিকদের অসহায় অবস্থার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। এই নথিভুক্ত অভিযোগগুলোই দেখায় যে বিদেশে কাজ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়া নারীদের জন্য কার্যকর অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিকারব্যবস্থা কতটা জরুরি। তবে নথিভুক্ত অভিযোগের সংখ্যা দিয়ে নির্যাতনের প্রকৃত ব্যাপ্তি নির্ধারণ করা যায় না; ভয়, ভাষাগত সমস্যা, দূতাবাসে পৌঁছানোর অসুবিধা কিংবা প্রতিশোধের আশঙ্কায় অনেকে অভিযোগ জানাতেই পারেন না।
শুধু নির্যাতনের অভিযোগ নয়, বিদেশে নারী শ্রমিকদের মৃত্যুর ঘটনাও গভীর উদ্বেগের বিষয়। *দ্য ডেইলি স্টার*-এর ১৮ এপ্রিল ২০২৬-এর প্রতিবেদনে মজুরি শ্রমিকদের কল্যাণ বোর্ডের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, গত আট বছরে ৭৯৯ জন নারী অভিবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তাঁদের অধিকাংশের মৃত্যু সনদে আত্মহত্যার কথা লেখা ছিল; সৌদি আরব থেকে এমন ঘটনা সবচেয়ে বেশি নথিভুক্ত হয়েছে, এরপর জর্ডান ও লেবাননের নাম এসেছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি এবং প্রতিটি ঘটনার পেছনের বাস্তবতা জানতে পৃথক তদন্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। এই পরিসংখ্যানকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে প্রবাসী নারী শ্রমিকদের মানসিক স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ এবং জরুরি সহায়তার ব্যবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন নারী শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার পর তাঁর নিরাপত্তার প্রশ্নটি শুধু ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বিএমইটি, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস, নিয়োগকারী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের সমন্বিত ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের আইনি সুরক্ষার প্রশ্নটিও সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশিত হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ তাঁদের বিরুদ্ধে একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগের কথা জানায়। সংবাদমাধ্যমে তাঁদের নাম নাজেরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিটি আখতার হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তের পর মামলা হয়, আদালত তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত বলে রায় দেন এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে প্রকাশিত বিবৃতিতে ঘটনার সুনির্দিষ্ট বিবরণ দেওয়া হয়নি।
এই ঘটনায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তারা এ বিষয়ে অবহিত ছিল না। ১৮ অক্টোবর বাংলাদেশ সৌদি আরবের কাছে ঘটনার বিস্তারিত, বিচারপ্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশি মিশনকে আগে জানানো হয়নি কেন এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা চায়। *দ্য ডেইলি স্টার*-এর ১৯ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি কর্তৃপক্ষ আগে বন্দিদের একটি তালিকা বাংলাদেশি মিশনকে পাঠিয়েছিল, কিন্তু ওই তালিকায় দুই ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ডের রায়ের তথ্য উল্লেখ ছিল না। এই ঘটনায় মামলার পূর্ণাঙ্গ নথি ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত প্রকাশ্যে না থাকায় সব দিক সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
এই ঘটনাটি নারী শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের সঙ্গে সরাসরি এক নয়। তবে এটি বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা, বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে সময়মতো তথ্য পাওয়া এবং দূতাবাসের কনস্যুলার সহায়তার গুরুত্ব তুলে ধরে। বিশেষত নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, আর্থিক অসচ্ছলতা ও কর্মস্থল থেকে বিচ্ছিন্নতার কারণে আইনি সহায়তা পাওয়া আরও কঠিন হতে পারে। তাই বিদেশে কর্মরত নাগরিকদের জন্য স্থানীয় আইন সম্পর্কে সচেতনতা, প্রয়োজনে আইনজীবী ও দোভাষীর সহায়তা এবং ন্যায্য বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। বিদেশের আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি সম্মান রেখেই বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোর উচিত নাগরিকদের অধিকার ও প্রাপ্য সহায়তা সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা।
দেশে ফিরে আসা নারীদের জীবনও আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে। নির্যাতনের শিকার হয়ে কোনো নারী যখন স্বজনদের কাছে ফিরে আসেন, তখন তাঁর প্রয়োজন সহমর্মিতা, চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও পুনর্বাসন। অথচ অনেক ক্ষেত্রে সমাজের কটূক্তি, সন্দেহ এবং অপমান তাঁকে আরও অসহায় করে তোলে। কেউ কেউ নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভয় পান, কারণ তাঁদের আশঙ্কা মানুষ হয়তো অপরাধীর পরিবর্তে তাঁকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। নির্যাতনের শিকার হওয়া কোনো অপরাধ নয়। একজন নারী কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন, তা না জেনে তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিংবা তাঁর ওপর অপরাধের দায় চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়।
তাহলে কি নারীরা কখনোই তাঁদের প্রকৃত অধিকার খুঁজে পাবেন না? অবশ্যই পাবে,যদি অধিকারকে কেবল কাগজে লেখা প্রতিশ্রুতি হিসেবে না রেখে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। একজন নারী শ্রমিকের অধিকার মানে শুধু বিদেশে যাওয়ার সুযোগ কিংবা মাস শেষে বেতন পাওয়া নয়; এর অর্থ ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, বিশ্রাম, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, যৌন হয়রানি থেকে সুরক্ষা, চিকিৎসা, আইনি প্রতিকার এবং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। এ জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা, কার্যকর তদারকি, সহজলভ্য অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা, দূতাবাসের দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং দেশে ফিরে কর্মসংস্থানের সুযোগ। নারী শ্রমিকদের শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। তাঁরা মানুষ, তাঁরা নাগরিক, তাঁরা শ্রমিক! তাঁদেরও রয়েছে সমান মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের অধিকার।
একজন নারী পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়তে বিদেশে যাবেন, অথচ নিজের নিরাপত্তার জন্য প্রতিনিয়ত ভয় নিয়ে বাঁচবেন এই বাস্তবতাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া যায় না। তাঁর পাঠানো অর্থ দিয়ে যখন একটি পরিবার স্বপ্ন দেখে, তখন সেই স্বপ্নের পেছনে থাকা মানুষটির জীবনও নিরাপদ হওয়া চাই। রেমিট্যান্সের পরিমাণ দিয়ে একটি দেশের অর্থনৈতিক অর্জন পরিমাপ করা যেতে পারে, কিন্তু সেই অর্থ উপার্জনকারী মানুষের কান্না, অপমান ও নিরাপত্তাহীনতাকে উপেক্ষা করে প্রকৃত উন্নয়নের দাবি করা যায় না।
আজ তাই প্রশ্নটি শুধু প্রবাসী নারী শ্রমিকদের নয়; প্রশ্নটি আমাদের রাষ্ট্রের সক্ষমতা, সমাজের বিবেক এবং মানবাধিকারের প্রতি আমাদের অঙ্গীকারের। যে নারীর শ্রমে পরিবারের চুলা জ্বলে, যে নারীর উপার্জনে দেশের অর্থনীতি শক্তি পায়, সেই নারী বিদেশের মাটিতে নির্যাতিত হলে তাঁর পাশে দাঁড়াবে কে? তাঁর অধিকার নিশ্চিত করার দায় কার? আর কত দিন অর্থনৈতিক অবদানের স্বীকৃতি মিলবে, অথচ নিরাপত্তা ও মর্যাদার নিশ্চয়তা অধরাই থেকে যাবে?
নারীর অধিকার কোনো অনুগ্রহ নয়, কোনো দয়া নয়,এটি তাঁর ন্যায্য প্রাপ্য। তাই প্রবাসী নারী শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের কর্তব্য, নিয়োগকর্তার বাধ্যবাধকতা এবং সভ্য সমাজের নৈতিক অঙ্গীকার।
লেখক, কলামিস্ট ও সমাজকর্মী
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়