প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬ , ১২:১৩ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
হরমুজ প্রণালিতে কয়েক মাস ধরে আটকে থাকা শত শত বাণিজ্যিক জাহাজ এখন শুধু বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য নয়, সামুদ্রিক পরিবেশের জন্যও বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এসব জাহাজ চলাচল শুরু করলে তাদের গায়ে জন্ম নেওয়া আগ্রাসী সামুদ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদ বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্রবন্দরে ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাতের জেরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে দেড় হাজারের বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ আটকে রয়েছে। দীর্ঘ সময় স্থির অবস্থায় থাকায় জাহাজগুলোর তলদেশে শৈবাল, অণুজীব, বার্নাকল, ঝিনুক এবং বিভিন্ন অমেরুদণ্ডী সামুদ্রিক প্রাণীর আবাস গড়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় এ ঘটনাকে সম্ভাব্য 'সুপার-স্প্রেডার' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের ভাষ্য, ইতিহাসে এত বিপুলসংখ্যক জাহাজ কখনো এত দীর্ঘ সময় একসঙ্গে একই এলাকায় নোঙর করে থাকেনি। ফলে সামুদ্রিক আগ্রাসী প্রজাতি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও নজিরবিহীন।
গবেষণার প্রধান এবং মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান কেন্দ্রের অধ্যাপক মারিও ট্যাম্বুরি বলেছেন, পরিস্থিতি নিয়ে সবচেয়ে ভয়াবহ যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, বাস্তবে তা আরও ভয়ংকর হতে পারে।
সাধারণত কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ এক থেকে তিন দিনের বেশি নোঙর করে থাকে না। এতে জাহাজের গায়ে সামুদ্রিক জীবের বিস্তার সীমিত থাকে। কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা জাহাজগুলো কয়েক মাস ধরে একই স্থানে অবস্থান করায় সেখানে ঘন সামুদ্রিক জীবসম্প্রদায় তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব জাহাজ যখন আবার বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন বন্দরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করবে, তখন তাদের সঙ্গে বহন করা সামুদ্রিক জীব নতুন পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে স্থানীয় প্রজাতির সঙ্গে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা বাড়বে এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
গবেষকদের মতে, আগ্রাসী সামুদ্রিক প্রজাতিগুলো স্থানীয় জীববৈচিত্র্য কমিয়ে দিতে পারে এবং কিছু দেশীয় প্রজাতিকে বিলুপ্তির মুখেও ঠেলে দিতে পারে। একই সঙ্গে এগুলো মৎস্যসম্পদে ক্ষতি, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কুলিং সিস্টেমে বাধা সৃষ্টি এবং নিয়ন্ত্রণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের কারণ হতে পারে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের উচ্চ তাপমাত্রা ও অতিরিক্ত লবণাক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা এসব জীব তুলনামূলকভাবে বেশি সহনশীল। ফলে নতুন সামুদ্রিক পরিবেশেও তারা সহজে টিকে থাকতে সক্ষম হতে পারে। বিশেষ করে ভারত, সিঙ্গাপুরসহ উষ্ণ ও লবণাক্ত সমুদ্রবন্দরের দেশগুলোকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিজ্ঞানীরা।
শুধু জাহাজের বাইরের অংশই নয়, দীর্ঘদিন নোঙর করে থাকার কারণে জাহাজের ব্যালাস্ট পানিতেও বিভিন্ন অণুজীব, পরজীবী এবং অন্যান্য সামুদ্রিক জীব জমা হয়েছে। বৈশ্বিক নৌপরিবহণ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসব জীব দ্রুত এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজ্ঞানীরা কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে উপসাগর ত্যাগের আগে জাহাজগুলোকে সম্পূর্ণভাবে পরীক্ষা ও পরিষ্কার করা, গন্তব্য বন্দরে আগ্রাসী প্রজাতি শনাক্তে নজরদারি বাড়ানো এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হলে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র, যেমন প্রবালপ্রাচীর, সি-গ্রাসের তৃণভূমি এবং ঝিনুকের প্রাকৃতিক আবাসস্থল অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। তাই মানবিক ও ভূরাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি এ পরিবেশগত ঝুঁকিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।