প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬ , ০৫:৩৯ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
২০২৬ সালের ১৫ মে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত সুপ্রিম কোর্টের এক শুনানিতে বেকার তরুণদের "তেলাপোকা" ও "সমাজের পরজীবী" বলে মন্তব্য করেছিলেন। এই মন্তব্য দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ঝড় তোলে। পরদিনই ১৬ মে রাজনৈতিক যোগাযোগ পরামর্শক অভিজিৎ দিপকে—যিনি এর আগে আম আদমি পার্টির সাথে কাজ করেছেন-একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন আন্দোলন চালু করেন: 'ককরোচ জনতা পার্টি' (CJP), যার স্লোগান "অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর"। কয়েক দিনের মধ্যেই আন্দোলনটি ইনস্টাগ্রামে দুই কোটির বেশি অনুসরণকারী সংগ্রহ করে—যা বিজেপি ও কংগ্রেসের অফিসিয়াল অ্যাকাউন্টগুলোকেও ছাপিয়ে যায়। শুরুতে নিছক মিম ও ব্যঙ্গচিত্রের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন ক্রমে দেশের সবচেয়ে বড় তরুণ-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। জুন মাসের শুরুতে দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপি বিক্ষোভ শুরু করে, যাতে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোও যুক্ত হয়। প্রাথমিকভাবে সুনির্দিষ্ট দাবি না থাকলেও, আন্দোলনটি ধীরে ধীরে ২০২৬ সালের নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস ও সিবিএসই-র অনস্ক্রিন মার্কিং কারচুপি ইস্যুতে জোরালো হয়ে উঠে। ২২ লক্ষেরও বেশি পরীক্ষার্থী এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং অন্তত ২০ জন পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন বলে জানা যায়। এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলোই আন্দোলনকে একটি বিমূর্ত ব্যঙ্গ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট দাবি-ভিত্তিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করে এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি তোলে।
২৮ জুন শিক্ষা-অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করলে আন্দোলনটি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৮ জুলাই সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেও অনশন শুরু করেন। ২১ দিনের অনশনের পর পুলিশ জোরপূর্বক ওয়াংচুককে হাসপাতালে নিয়ে যায়, এবং ২০ জুলাই পার্লামেন্ট অভিমুখী মিছিলে লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস, নারীদের প্রতি অসম্মান-সহ একাধিক অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে, যা সরকারকে কড়া সমালোচনার মুখে ফেলে।
সরকার-সিজেপির মধ্যে একাধিক দফা বৈঠকের পর ২৫ জুলাই শনিবার দুপুরে ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তৃতীয় দফা বৈঠকে সরকার বাকি দাবিগুলোও মেনে নেয় এবং সিজেপি একে "ছাত্রশক্তির জয়" ঘোষণা করে যন্তর মন্তরের আন্দোলন প্রত্যাহার করে।
আন্দোলনের শুরু থেকেই এটি মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করে। সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব এক্সে লেখেন "বিজেপি বনাম সিজেপি", আর মধ্যপ্রদেশ কংগ্রেস নেতা উমাং সিংহার সরকারকে তরুণদের ক্ষোভ শোনার আহ্বান জানান। বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদব সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা করেন যখন সিজেপি'র এক্স অ্যাকাউন্ট ভারতে বন্ধ করা হয় এবং তিনি এটিকে ব্যঙ্গের প্রতি সরকারের "ভীতি" বলে বর্ণনা করেন। তবে এই আন্দোলনের একটি কম আলোচিত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো সঙ্ঘ পরিবারের অভ্যন্তরীণ চাপের সম্ভাব্য ভূমিকা। ধর্মেন্দ্র প্রধান নিজে বিজেপির নেতা হলেও তাঁর রাজনীতির সূচনা RSS-এর ছাত্র সংগঠন ABVP-এর মাধ্যমে, এবং তাঁকে RSS-ঘনিষ্ঠ বলেই গণ্য করা হয়। সাংবাদিক লভ কুমার মিশ্রের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রধানের পদত্যাগের পেছনে RSS প্রধান মোহন ভাগবতের বিবৃতিরও প্রভাব থাকতে পারে—ভাগবত দিল্লির এক অনুষ্ঠানে বলেন, নতুন প্রজন্ম প্রশ্ন করে এবং তাদের যুক্তি দিয়ে বোঝাতে হবে। এই পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায়, সরকার আন্দোলনকে কেবল বাহ্যিক চাপ নয়, বরং নিজের রাজনৈতিক পরিবারের অভ্যন্তরীণ উদ্বেগ হিসেবেও বিবেচনা করেছে। অন্যদিকে সমালোচকদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছে—দিপকের অতীত রাজনৈতিক সংযোগ দেখিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে যে আন্দোলনটি বিরোধী দলের দ্বারা পরিচালিত হতে পারে। বিজেপি-পন্থী সামাজিক মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের "চীনের দালাল", "দেশ-বিরোধী", "ডিপ স্টেটের চক্রান্ত" ইত্যাদি বলে অভিহিত করা হয়—এই প্রতি-বয়ান কৌশলটি শাহীনবাগের CAA-বিরোধী আন্দোলন ও কৃষক আন্দোলনের সময়ও ব্যবহৃত হয়েছিল, যা প্রমাণ করে এটি সরকারপন্থী মহলের একটি পরিচিত কৌশল। অন্য একটি বিশ্লেষণী দৃষ্টিকোণ থেকে এই আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে যে আন্দোলনটি ভারতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে, এবং প্রশ্ন তোলা হয়েছে এটি স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ, নাকি ভারতের স্থিতিশীলতা দুর্বল করার হিসেবি প্রচারণা। আল জাজিরার একটি বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে যে বিজেপি ২০২৪ সালের নির্বাচনে জাতীয়ভাবে মোট ভোটের এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি পেয়েছিল—অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার মোদির পুনর্নির্বাচনকে সমর্থন করেননি। এই প্রেক্ষাপটে বলা হচ্ছে, দলটির ক্ষমতা প্রকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর নয় বরং জোট গঠন ও বিরোধী দলের বিভক্তির ওপর নির্ভরশীল—যে ফাঁক দিয়ে সিজেপি'র মতো আন্দোলন প্রবেশ করতে পেরেছে। প্রবীণ সাংবাদিক নীরজা চৌধুরী এই পদত্যাগকে "সবার জন্য লাভজনক" পরিস্থিতি হিসেবে দেখছেন—বিরোধী দল, ছাত্রছাত্রী, এমনকি গণতন্ত্রের জন্যও। তিনি একে ১৯৭৭ সালের জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনের সাথে তুলনা করেছেন, যা তিন বছর পর সাফল্য পেয়েছিল, অথচ এই আন্দোলন মাত্র ৩৬ দিনেই সরকারকে নতি স্বীকার করাতে বাধ্য করেছে।
অন্যদিকে সাংবাদিক রশিদ কিদওয়াই এতে একটি সম্ভাব্য কৌশলগত সুযোগও দেখছেন সরকারের জন্য—যদি এই "বিজয়ে"র কৃতিত্ব নেওয়া নিয়ে ছাত্র সংগঠন ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তাহলে সরকার সেই বিভেদ কাজে লাগিয়ে সংসদের চলতি অধিবেশনে সীমানা পুনর্নির্ধারণের মতো বিতর্কিত বিল পাস করিয়ে নিতে পারে। এই দুই বিপরীতমুখী পাঠ থেকে স্পষ্ট হয়, তাৎক্ষণিক বিজয়টি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক লাভে রূপান্তরিত হবে কিনা তা এখনো অমীমাংসিত। দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলো একটি অভিন্ন প্যাটার্ন পরিলক্ষিত হয়। ক্ষমতাসীনদের একটি অবজ্ঞাসূচক শব্দই বিশাল গণআন্দোলনের সূচনা করতে পারে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা-আন্দোলনকারীদের 'রাজাকারের নাতিপুতি' বলে মন্তব্য করলে তা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর পতন ঘটায়। একই প্যাটার্ন দেখা যায় ভারতে—প্রধান বিচারপতির 'তেলাপোকা' মন্তব্য রাতারাতি জাতীয় আন্দোলনে রূপ নেয়। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষামন্ত্রী এইচএসসি শিক্ষার্থীদের 'ফার্মের মুরগি' বলে ব্যঙ্গ করলে তাও ক্ষোভের জন্ম দেয়, যদিও তার পরিণতি প্রধান বিচারপতি বা প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের মতো ব্যাপক হয়নি। এই ঘটনাগুলো একটি সাধারণ শিক্ষা দেয়, ক্ষমতাসীনদের প্রকাশ্য ভাষা এখন তরুণ প্রজন্মের কাছে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পর্শকাতর এবং দ্রুত রাজনৈতিক পরিণতি বহন করে।
এই আন্দোলনগুলোর প্রতিটির একটি অভিন্ন কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য হলো প্রযুক্তির কেন্দ্রীয় ভূমিকা। প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের পরদিনই অভিজিৎ দিপকে এক্স ও ইনস্টাগ্রামে আন্দোলনের ডাক দেন এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা ভাইরাল হয়ে যায়। নেপালেও অনুরূপভাবে সামাজিক মাধ্যম নিষেধাজ্ঞাই আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চিরাচরিত স্লোগানের পরিবর্তে তরুণেরা ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ ও প্রতীকী লড়াই বেছে নিয়েছে। অপমানের শব্দ 'তেলাপোকা'-কেই তারা নিজেদের শক্তির প্রতীকে পরিণত করেছে—ঠিক যেভাবে বাংলাদেশে ছাত্ররা 'রাজাকার' শব্দকে পাল্টা প্রতিরোধের হাতিয়ার বানিয়েছিল। মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে হাজার হাজার তরুণ রাতারাতি জড়ো হতে পারে, কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা দলীয় কাঠামো ছাড়াই। নেপালে এর সবচেয়ে চূড়ান্ত রূপ দেখা গেছে, যেখানে একটি ডিসকর্ড সার্ভারে দশ হাজারের বেশি সদস্য অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রীর নাম নিয়ে ভোটাভুটি করেছিলেন। পুলিশি দমনপীড়নের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে জনরোষ আরও তীব্র করে তোলে। ককরোচ জনতা পার্টি আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে যে আজকের ভারতে ব্যঙ্গ ও মিম কীভাবে দ্রুত সংগঠিত রাজনৈতিক চাপে রূপান্তরিত হতে পারে, এবং একটি একক অবমাননাকর মন্তব্য কীভাবে জাতীয় পর্যায়ের আন্দোলনের বীজ বপন করতে পারে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ আন্দোলনের একটি বাস্তব ও ঐতিহাসিক সাফল্য—নরেন্দ্র মোদীর তিন মেয়াদের শাসনে এই প্রথমবার কোনো আন্দোলনের চাপে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হলো। কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখনও নির্ধারিত হয়নি। এটি কি বাংলাদেশের জাতীয় নাগরিক পার্টি বা নেপালের রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির মতো একটি স্থায়ী রাজনৈতিক কাঠামোয় রূপ নেবে, নাকি সাময়িক ভাইরাল উত্তেজনার পর হারিয়ে যাবে—এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে আন্দোলনটি তার বিকেন্দ্রীকৃত, নেতৃত্ব-বিহীন চরিত্র বজায় রেখেও সাংগঠনিক স্থায়িত্ব অর্জন করতে পারে কিনা তার ওপর।
লেখক: নির্মাতা ও সংস্কৃতিকর্মী