প্রকাশিত: ২৮ জুন ২০২৬ , ০৯:০৬ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরকে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের এক নতুন কৌশলগত অধ্যায় হিসেবে দেখছে সরকার। সফরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা, নদী ব্যবস্থাপনা, শিল্পায়ন ও আঞ্চলিক সংযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা হয়েছে। বিশেষ করে মোংলা বন্দর উন্নয়ন, তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর এবং পররাষ্ট্র-প্রতিরক্ষা সংলাপ চালুর সিদ্ধান্ত সফরের উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠক শেষে গত শুক্রবার দেশে ফেরেন প্রধানমন্ত্রী। প্রায় এক দশক পর কোনো বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর হওয়ায় এটিকে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্পর্ক উন্নীত হলো নতুন পর্যায়ে
সফরের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বাংলাদেশ ও চীন তাদের সম্পর্ককে 'সার্বিক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব' থেকে 'অভিন্ন ভবিষ্যৎ নির্মাণের অংশীদারিত্বে' উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে।
শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সফর-পরবর্তী ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকে রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ জোরদারের বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, এই সমঝোতা ভবিষ্যতে দুই দেশের সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকর ভিত্তি দেবে।
১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা
চীন সফরে মোট ১৭টি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), কর্মপরিকল্পনা ও সহযোগিতা দলিলে স্বাক্ষর হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে মানবসম্পদ উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা, সবুজ জ্বালানি, উন্নয়ন সহযোগিতা, গণমাধ্যম, চীনা ভাষা শিক্ষা, মোংলা বন্দর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, কাঁঠাল রপ্তানি, রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিল্প বিনিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন সমঝোতা।
এছাড়া বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়নে একাধিক বিনিয়োগ চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছে।
মোংলা বন্দর উন্নয়নে চীনের সহায়তা
সফরে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন গতি এসেছে। দুই দেশ দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নে একমত হয়েছে। বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পাঞ্চল উন্নয়নে চীনের সহযোগিতা আরও জোরদার হবে।
একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও মোংলার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে।
তিস্তা প্রকল্পে বাস্তব অগ্রগতি
তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প (টিআরসিএমআরপি) বাস্তবায়নের প্রস্তুতি এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ ও চীন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করা হবে। পাশাপাশি নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি সংরক্ষণ, নদী খনন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়েও সহযোগিতা বাড়ানো হবে।
করিডোর ও আঞ্চলিক সংযোগে নতুন উদ্যোগ
সফরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোরের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া কুনমিং থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত মাল্টিমোডাল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর আওতায় অবকাঠামো ও শিল্প খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও দুই দেশ একমত হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক ছোট প্রকল্পেও চীনের সহযোগিতা বাড়বে।
পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষায় নতুন সংলাপ
সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে 'টু প্লাস টু (২+২)' সংলাপ চালু করা।
এই কাঠামোর আওতায় দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা নিয়মিত বৈঠকে মিলিত হবেন। পাশাপাশি কৌশলগত সংলাপ, সামরিক প্রতিনিধি বিনিময়, প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হবে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশ পুনরায় 'এক চীন' নীতির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। অপরদিকে চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিজস্ব উন্নয়নের পথ বেছে নেওয়ার অধিকারের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
এছাড়া সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও), আঞ্চলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব (আরসিইপি) এবং অন্যান্য আঞ্চলিক উদ্যোগে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে বেইজিং।
সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাব
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের সাফল্য উপলক্ষে জাতীয় সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।
প্রস্তাবের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষাই তাঁর সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল। তিনি বলেন, "যদি এই সফরে কোনো অর্জন হয়ে থাকে, সেটি বাংলাদেশের অর্জন এবং দেশের মানুষের অর্জন।"
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারেও অগ্রগতি
চীন সফরের আগে মালয়েশিয়া সফর সম্পর্কেও ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ পুনরায় চালু, আট হাজার কর্মীর কাজে যোগদান, দক্ষ কর্মী পাঠানো, অনিয়মিত কর্মীদের বৈধকরণ এবং নিয়োগ ব্যয় কমানোর বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া, যৌথ বিজনেস কাউন্সিল গঠন এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও ইতিবাচক অগ্রগতির কথা জানানো হয়।