খেলাধুলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ জুন ২০২৬ , ০৮:৪৫ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

বিশ্বকাপে এখন আর ভুলের সুযোগ নেই, শুরু নকআউটের নির্মম অধ্যায়

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব শেষ হয়েছে। চারদিকের হিসাব-নিকাশ, গোল ব্যবধানের অঙ্ক, তৃতীয় স্থানধারীদের ভাগ্যের অপেক্ষা এবং শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা এখন ইতিহাস। আজ থেকে শুরু হচ্ছে এমন এক অধ্যায়, যেখানে আর কোনো দ্বিতীয় সুযোগ নেই। একটি ভুল, একটি মুহূর্তের অসাবধানতা, একটি গোল কিংবা একটি পেনাল্টিই নির্ধারণ করে দিতে পারে একটি জাতির চার বছরের স্বপ্নের পরিণতি।

২০২৬ বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম ৪৮ দলের আসর। ফলে নকআউট পর্বও আগের চেয়ে আরও বিস্তৃত। রাউন্ড অব ৩২ দিয়ে শুরু হওয়া এই নতুন অধ্যায় ফুটবলকে শুধু দীর্ঘতর করেনি, আরও অনিশ্চিত ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে। গ্রুপ পর্বে দেখা গেছে, অনেক শক্তিশালী দল নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করলেও বেশ কয়েকটি তুলনামূলক ছোট দল সাহসী ফুটবল খেলে বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। সেই কারণেই নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচ এখন এক একটি স্বতন্ত্র গল্প।

আজকের উদ্বোধনী লড়াই দক্ষিণ আফ্রিকা ও কানাডার। সহ-আয়োজক কানাডা নিজেদের মাঠের সমর্থনকে শক্তিতে রূপ দিতে চায়। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা লিখতে চায় আফ্রিকান ফুটবলের নতুন ইতিহাস। বিশ্বকাপে স্বাগতিকের আবেগ এবং আফ্রিকান সাহসের এই দ্বৈরথ নকআউট পর্বের শুরুতেই দর্শকদের জন্য আকর্ষণীয় এক মঞ্চ তৈরি করেছে।

পরবর্তী কয়েক দিনের সূচি আরও জমজমাট। ব্রাজিলের সামনে জাপান। এটি শুধু একটি নকআউট ম্যাচ নয়, বরং কার্লো আনচেলত্তির জন্যও একটি বড় পরীক্ষা। গ্রুপ পর্বে দলটি শক্তির পরিচয় দিলেও নকআউটে প্রতিপক্ষের সামান্য সুযোগও ক্ষমার অযোগ্য হয়ে ওঠে। আনচেলত্তির ব্রাজিল এখন কৌশলগত পরিপক্বতার কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে। ইনজুরির কারণে রাফিনিয়ার অনুপস্থিতি এবং স্কোয়াড ব্যবস্থাপনাও ব্রাজিলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।

ইংল্যান্ডও আত্মবিশ্বাস নিয়ে নকআউটে প্রবেশ করছে। গ্রুপ পর্বে পানামাকে হারিয়ে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করার পর কোচ টমাস টুখেল বলেছেন, বড় ম্যাচই তাঁর দলকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে। তবে ডিফেন্ডার জ্যারেল কোয়ানসাহর চোট ইংলিশ শিবিরে কিছুটা উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে রিস জেমসের অনুপস্থিতিও তাদের রক্ষণভাগের পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।

এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণ গণতান্ত্রিক কঙ্গো। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে উঠে তারা ইতোমধ্যেই কোটি কোটি নিরপেক্ষ দর্শকের সমর্থন অর্জন করেছে। তাদের সামনে এখন ইংল্যান্ড। আফ্রিকার উদীয়মান শক্তি এবং ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী পরাশক্তির এই লড়াই কেবল ফুটবলীয় নয়, মানসিক দৃঢ়তারও পরীক্ষা।

অন্যদিকে স্পেন কিছুটা দুশ্চিন্তায় রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ দুই ফুটবলারের চোট তাদের আক্রমণভাগের ভারসাম্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। দীর্ঘ টুর্নামেন্টে শুধু সেরা একাদশ নয়, পুরো স্কোয়াডের গভীরতাই যে শেষ পর্যন্ত শিরোপা নির্ধারণ করে, সেই বাস্তবতা আবারও সামনে চলে এসেছে।

গ্রুপ পর্বের শেষ দিনগুলো ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। শেষ মুহূর্তের গোল, গোল ব্যবধানের হিসাব এবং তৃতীয় স্থানধারীদের জটিল সমীকরণে ইরান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দল বিদায় নিয়েছে। আবার সেনেগাল, গণতান্ত্রিক কঙ্গোসহ কয়েকটি দল শেষ মুহূর্তে টিকে থেকে নকআউটে নতুন উত্তেজনা যোগ করেছে। এই নাটকীয় সমাপ্তিই প্রমাণ করেছে, সম্প্রসারিত বিশ্বকাপে প্রতিটি গোলের মূল্য কতটা অসীম।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এখন নতুন বাস্তবতা। স্বাগতিক হওয়ার বাড়তি চাপের পাশাপাশি দেশটির সামনে রয়েছে বহু বছরের নকআউট অচলাবস্থা ভাঙার চ্যালেঞ্জ। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচটি শুধু পরবর্তী রাউন্ডে ওঠার লড়াই নয়, বরং মার্কিন ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতিরও প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্বকাপের ইতিহাস বলছে, গ্রুপ পর্বে সবচেয়ে সুন্দর ফুটবল খেলেছে এমন দল সবসময় শিরোপা জেতে না। বরং নকআউট পর্বে জয়ী হয় সেই দল, যারা চাপ সামলাতে পারে, সুযোগকে কাজে লাগায় এবং সংকটের মুহূর্তে নিজেদের সংযত রাখতে জানে। তাই আজ থেকে শুরু হওয়া প্রতিটি ম্যাচ এক একটি ফাইনালের সমান।

ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসব এখন প্রবেশ করেছে তার সবচেয়ে নির্মম অথচ সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়ে। আগামী কয়েক দিনে আনন্দ, বেদনা, বিস্ময়, কান্না এবং ইতিহাস একই মঞ্চে পাশাপাশি দাঁড়াবে। আর সেখান থেকেই ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠবে, কে এগিয়ে যাচ্ছে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য মহারণের দিকে, আর কার স্বপ্ন শেষ হয়ে যাচ্ছে এক সন্ধ্যার বাঁশির সঙ্গে।