প্রকাশিত: ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ , ০৭:৪৩ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
আজ পবিত্র শবে বরাত। মঙ্গলবার সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হবে পরম কাঙ্ক্ষিত সেই রজনী, যা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে পাপমুক্তি ও আত্মশুদ্ধির এক বিশেষ সুযোগ হিসেবে পরিচিত। ফারসি ‘শব’ মানে রাত আর ‘বরাত’ মানে মুক্তি। অর্থাৎ এটি মুক্তির রাত। তবে ধর্মীয় বিধান ও এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আলেম-ওলামাদের মধ্যে রয়েছে নানা বিশ্লেষণ ও মতভিন্নতা।
আধ্যাত্মিক আবহ ও ইবাদত
উপমহাদেশের মুসলমানদের কাছে এই রাতটি ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বা শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাত হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্ববহ। ধর্মপ্রাণ মানুষ এ রাতে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় নফল নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, জিকির-আসকার ও তওবা-ইস্তেগফারে মগ্ন থাকেন। অনেকে পরদিন নফল রোজা রাখেন। বিশেষ করে মৃত স্বজনদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় কবর জিয়ারত করার রেওয়াজও এ দেশে বেশ পুরনো।
হাদিসের আলোকচ্ছটা ও ভিন্নমত
শবে বরাতের ফজিলত সম্পর্কে ইবনে মাজাহ ও বাইহাকীর একটি হাদিসে হজরত আলী (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, মধ্য শাবানের রাতে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং ফজর পর্যন্ত ক্ষমা ও রিজিক প্রার্থনাকারীদের আহ্বান করতে থাকেন। যদিও অনেক বিশেষজ্ঞ এই হাদিসটির সূত্র দুর্বল বলে মনে করেন।
অন্যদিকে, সহিহ বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, আল্লাহ তায়ালা প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশেই দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করে বান্দার ডাকে সাড়া দেন। এ কারণেই বর্তমান সময়ের অনেক বিজ্ঞ আলেম মনে করেন, শবে বরাতের জন্য বিশেষ কোনো আনুষ্ঠানিক ইবাদত বা উৎসবের ভিত্তি ইসলামে নেই। বরং নফল ইবাদত ব্যক্তিগতভাবে হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
ইতিহাসের পাতা থেকে: কীভাবে শুরু হলো এই প্রথা?
ইতিহাসবিদদের মতে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিদের যুগে বর্তমান আঙ্গিকে শবে বরাত পালনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। ইবনে কাসিরের ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ এবং অন্যান্য ইতিহাস গ্রন্থ অনুযায়ী, হিজরি ৪৪৮ সনে ফিলিস্তিনের নাবলুস থেকে আসা ইবনে আবিল হামরা নামক এক ব্যক্তির মাধ্যমে প্রথম বায়তুল মুকাদ্দাসে এই রাতের নামাজের প্রচলন ঘটে। পরবর্তীতে ইরান হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে এটি ঐতিহ্যে রূপ নেয়। এ কারণে হালুয়া-রুটি বিতরণ বা আলোকসজ্জার মতো বিষয়গুলোকে অনেক আলেম ‘বিদআত’ বা ইসলাম বহির্ভূত প্রথা হিসেবে চিহ্নিত করেন।
সরকারি প্রস্তুতি ও প্রধান উপদেষ্টার বাণী
পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষে রাজধানীসহ সারাদেশের মসজিদগুলোতে বিশেষ ওয়াজ মাহফিল ও দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আগামীকাল বুধবার সরকারি ছুটি। সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ ক্রোড়পত্র।
এক বাণীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস দেশ ও জাতির কল্যাণে প্রার্থনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, "পবিত্র শবে বরাত আমাদের জীবনে রহমত ও আত্মিক পরিশুদ্ধির অনন্য সুযোগ। এই রাতে দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি কামনায় আমাদের আত্মনিয়োগ করতে হবে।"
বর্তমান প্রেক্ষাপট
বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশ, যেমন সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্যে এই রাতটি ঘিরে বিশেষ কোনো আয়োজন দেখা যায় না। তবে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত ও তুরস্কে এটি সামাজিকভাবেও বড় একটি উৎসবে পরিণত হয়েছে। আলেমদের পরামর্শ—উৎসবের চেয়ে একাগ্রচিত্তে স্রষ্টার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা এবং তওবাই হোক এই রাতের মূল উদ্দেশ্য।