ভাষা নির্বাচন / Select Language
  • 🇧🇩
    বাংলা মূল ভাষা (Original)
  • 🇺🇸
    English English
কাজী শামসুল হক • প্রকাশিত: ২৫ অক্টোবার ২০২৬, ১০:০৮ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

ভারতে ছাত্র-জনতার আন্দোলন: গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মোদি সরকারের বিরুদ্ধে কেন বাড়ছে ক্ষোভ

ভারতে ছাত্র-জনতার আন্দোলন: গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মোদি সরকারের বিরুদ্ধে কেন বাড়ছে ক্ষোভ

পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে ভোটার তালিকা সংশোধন, বেকারত্ব থেকে নাগরিক অধিকার—ভারতের রাজনীতিতে একাধিক অসন্তোষের ধারা মিলিত হচ্ছে ছাত্র-যুব আন্দোলনে। দিল্লি থেকে মুম্বাই পর্যন্ত বিক্ষোভ, গণগ্রেপ্তার এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক নতুন করে সামনে এনেছে প্রশ্ন: বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে জনগণের প্রতিবাদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত?

ভারতের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রসমাজ ও তরুণদের নেতৃত্বে যে প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তা কেবল একটি সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষা ও নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের বিতর্ক এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে পুলিশের ভূমিকা—সব মিলিয়ে আন্দোলনকারীদের একাংশ এখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির প্রশ্ন তুলছে।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ছাত্রবিক্ষোভ তীব্র হয়। এরপর সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) ঘিরে নতুন আন্দোলন শুরু হয়। অক্টোবরের প্রথমার্ধে দিল্লিসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ, আটক ও পুলিশি নিয়ন্ত্রণের ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নজর কাড়ে।

১০ অক্টোবর দিল্লিতে হাজারো বিক্ষোভকারীকে আটক করার খবর প্রকাশ করে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস। ১৩ অক্টোবর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও নির্বিচার আটকের অভিযোগ তুলে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

তবে এসব বিক্ষোভকে ভারতের সমগ্র জনগোষ্ঠীর অভিন্ন অবস্থান হিসেবে দেখা যথাযথ নয়। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপির উল্লেখযোগ্য নির্বাচনী সমর্থন এখনো রয়েছে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ অস্বীকার করে সরকার ও নির্বাচন কমিশন তাদের পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়েছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতির বিশ্লেষণে আন্দোলনের বাস্তব বিস্তার এবং রাজনৈতিক মতভেদের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।

১. পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস: ছাত্রক্ষোভের গুরুত্বপূর্ণ সূচনা

ভারতের বিপুলসংখ্যক তরুণের কাছে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাইয়ের মাধ্যম নয়; এটি সামাজিক অগ্রগতি, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অন্যতম পথ।

কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরীক্ষা পুনরায় নেওয়ার ঘটনায় বহু পরীক্ষার্থীর মধ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিবাদ শুরু হয়। রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে পরীক্ষার চাপ, অনিয়মের অভিযোগ ও কয়েকজন পরীক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা উঠে আসে।

২৩ জুলাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য দায়ীদের বিচারে দ্রুত বিচার আদালত গঠনের ঘোষণা দেন। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের একটি বড় অংশ তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ও শিক্ষা প্রশাসনের জবাবদিহি দাবি করে।

এই সংকটের রাজনৈতিক তাৎপর্য হলো, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ পরীক্ষার ফলাফল ছাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে পৌঁছায়। দীর্ঘ প্রস্তুতি, পারিবারিক বিনিয়োগ এবং প্রতিযোগিতার পর একটি পরীক্ষার অনিয়ম শিক্ষার্থীদের কাছে প্রশাসনিক ব্যর্থতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি করে।

২. নতুন প্রজন্মের প্রতিবাদ: ‘ককরোচ’ আন্দোলনের উত্থান

অক্টোবরে নতুন করে আলোচনায় আসে তরুণদের নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টি বা Cockroach Janta Party (CJP) নামে পরিচিত আন্দোলন। ছাত্রসংগঠন, নাগরিক অধিকারকর্মী এবং বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনের অংশগ্রহণে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আরও দৃশ্যমান হয়।

তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, বিতর্কিত ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার পুনর্বিবেচনা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারের সুরক্ষা।

সাম্প্রতিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ

২০২৬

জুলাই: প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পুনঃপরীক্ষার ঘটনায় ছাত্র-যুব বিক্ষোভ তীব্র হয়।

২৫ সেপ্টেম্বর: ভোটার তালিকা সংশোধনের অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে নতুন প্রতিবাদ শুরু হয় বলে মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

২ অক্টোবর: দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ ঠেকাতে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন ও শত শত মানুষকে আটকের খবর প্রকাশিত হয়।

১০ অক্টোবর: দিল্লিতে বড় প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘিরে হাজারো বিক্ষোভকারী আটক হন।

১৯ অক্টোবর: আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট দুই নেতার বিচারিক হেফাজতের মেয়াদ বাড়ানোর খবর প্রকাশিত হয়।

সূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

এ আন্দোলনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তরুণদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া প্রতিবাদে সংগঠিত বিরোধী রাজনীতির অংশগ্রহণ। তবে ছাত্রদের দাবি এবং বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সব ক্ষেত্রে অভিন্ন নয়। আন্দোলনের মধ্যে স্বতন্ত্র নাগরিক উদ্যোগ যেমন রয়েছে, তেমনি দলীয় রাজনৈতিক অবস্থানও রয়েছে।

৩. ভোটার তালিকা বিতর্ক: গণতান্ত্রিক আস্থার প্রশ্ন

সাম্প্রতিক আন্দোলনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হলো ভারতের নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধন।

নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য মৃত, দ্বৈত নিবন্ধিত অথবা অযোগ্য ব্যক্তিদের নাম বাদ দিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা।

অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, সংশোধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং যথাযথ যাচাইয়ের অভাবে বিপুলসংখ্যক বৈধ ভোটার বাদ পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন। বিশেষ করে সংখ্যালঘু, নারী এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর এর অসম প্রভাব পড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ১৩ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশোধন প্রক্রিয়ায় ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তবে এই সংখ্যা প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখিত বাদ পড়া নামের হিসাব; ১৩ কোটি যোগ্য ভোটার বেআইনিভাবে ভোটাধিকার হারিয়েছেন—এমন সিদ্ধান্ত এর ভিত্তিতে টানা যায় না।

নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কমিশনের অবস্থান হলো, তালিকা সংশোধন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় এবং ভুলবশত বাদ পড়া যোগ্য ব্যক্তিদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্থা রয়েছে।

এখানে মৌলিক প্রশ্ন দুটি: ভোটার তালিকা নির্ভুল রাখার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব কীভাবে পালন করা হবে এবং সেই দায়িত্ব পালনের সময় একজন যোগ্য নাগরিকের ভোটাধিকার কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এ দুটি লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী হওয়ার কথা নয়। বরং স্বচ্ছ যাচাই, কার্যকর আপিলের সুযোগ এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণ একসঙ্গে নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ।

৪. পুলিশি অভিযান ও গণগ্রেপ্তার: প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে বিতর্ক

১০ অক্টোবর দিল্লিতে আন্দোলনকারীদের একটি বড় সমাবেশ ঠেকাতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন, কয়েকটি মেট্রো স্টেশন বন্ধ এবং মোবাইল ইন্টারনেট সেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘটনাও ঘটে।

প্রশাসনের যুক্তি ছিল আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে বাধাগ্রস্ত করতে অতিরিক্ত বিধিনিষেধ প্রয়োগ করা হয়েছে।

২০ অক্টোবর জাতিসংঘের স্বাধীন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বন্ধ এবং অভিযোগগুলোর স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানান। তাঁদের বিবৃতিতে লাঠিপেটা, আহত হওয়া, দুর্ব্যবহার, ডিজিটাল নজরদারি ও সমাবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠে আসে।

ভারত সরকার এসব সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে জানায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইন মেনেই দায়িত্ব পালন করেছে। সরকার জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের সমালোচনাকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবেও দেখেছে।

এ বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ভারতীয় সংবিধানে স্বীকৃত মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার। রাষ্ট্র জননিরাপত্তার স্বার্থে আইনসম্মত ও যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে। কিন্তু সেই বিধিনিষেধ প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক কি না, সেটিও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

৫. বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা: তরুণদের উদ্বেগের আরেক কারণ

ভারতের সাম্প্রতিক ছাত্র-যুব আন্দোলনকে বুঝতে হলে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। অবকাঠামো নির্মাণ, প্রযুক্তি, উৎপাদন ও ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণকে মোদি সরকার উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে তুলে ধরে।

কিন্তু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানের মান, শিক্ষিত তরুণদের চাকরির সুযোগ এবং বিভিন্ন অঞ্চলে উন্নয়নের সুফল বণ্টন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

ভারত সরকারের সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর শ্রমশক্তি জরিপে ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ৫ শতাংশ। শহরাঞ্চলে এই হার ৬ দশমিক ৯ শতাংশ এবং শহুরে নারীদের ক্ষেত্রে ৯ দশমিক ২ শতাংশ।

ভারতে বেকারত্বের চিত্র

সেপ্টেম্বর ২০২৬, সাপ্তাহিক কর্মসংস্থান-অবস্থা ভিত্তিক সরকারি জরিপ

এই হারগুলো সব বয়সের তরুণদের বেকারত্ব বা শিক্ষিত বেকারত্বের পৃথক পরিমাপ নয়।

এই পরিসংখ্যান থেকে তরুণদের সামগ্রিক অসন্তোষের মাত্রা সরাসরি নির্ধারণ করা যায় না। তবে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে মানসম্মত চাকরির চাহিদা, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ওপর নির্ভরতা এবং পরীক্ষার অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বুঝতে তা সহায়ক।

বিশেষত যখন চাকরির জন্য দীর্ঘদিন প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষায় বসতে হয়, তখন বিষয়টি শুধু শিক্ষাগত নয়, আর্থিক ও সামাজিক সংকটেও রূপ নেয়।

৬. ক্যাম্পাস রাজনীতি, জাতপাত ও সামাজিক ন্যায়বিচার

ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঐতিহাসিকভাবেই রাজনৈতিক বিতর্ক ও সামাজিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৈষম্য প্রতিরোধের নতুন বিধিমালা প্রকাশ করলে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়।

বিধিমালার উদ্দেশ্য ছিল জাতপাতসহ নানা ধরনের বৈষম্য মোকাবিলা করা। কিন্তু একাংশের শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, বিধিমালার কিছু দিক অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে দলিত ও সামাজিক ন্যায়বিচারকেন্দ্রিক সংগঠনগুলোর একাংশ বৈষম্যবিরোধী সুরক্ষা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে।

পরে সুপ্রিম কোর্ট বিধিমালাটির কার্যকারিতা স্থগিত করেন এবং আগস্টে কেন্দ্রীয় সরকার আদালতকে জানায়, বিধিমালাটি পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।

এ ঘটনা দেখায়, ভারতের ছাত্ররাজনীতি শুধু সরকারপন্থী ও সরকারবিরোধী—এই দুই ভাগে সীমাবদ্ধ নয়। জাতপাত, সংরক্ষণনীতি, সমান অধিকার এবং সামাজিক সুরক্ষা নিয়েও ছাত্রসমাজের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে।

সুতরাং সব ছাত্রবিক্ষোভকে একটিমাত্র মোদিবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করলে ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ বৈচিত্র্য আড়ালে পড়ে যেতে পারে।

৭. মোদি সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান: নির্বাচনী শক্তি ও নতুন চাপ

নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে তৃতীয় মেয়াদের জোট সরকার

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ২৪০টি আসনে জয় পায়। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২৭২ আসন অর্জন করতে না পারলেও বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট সরকার গঠন করে।

২০১৪ ও ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৪ সালের নির্বাচন ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। কারণ বিজেপিকে এবার সরকার পরিচালনায় জোটের অংশীদারদের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রধান দলগুলোর আসন

সূত্র: ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের নির্বাচনী তথ্য।

২০২৪ সালের ফলাফলে বিরোধী দলগুলো সংসদে তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থান অর্জন করে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এ অবস্থায় ছাত্র-যুব আন্দোলনের সঙ্গে বিরোধী রাজনীতির সংযোগ মোদি সরকারের ওপর সংসদীয় ও রাজপথের চাপ একসঙ্গে সৃষ্টি করেছে।

তবে রাজপথের আন্দোলনকে সরাসরি সরকার পরিবর্তনের পূর্বাভাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ১৬ অক্টোবর রয়টার্সের বিশ্লেষণেও উল্লেখ করা হয়, বিক্ষোভ সরকারের জন্য রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করলেও জোট সরকার স্থিতিশীল রয়েছে এবং পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন নির্ধারিত রয়েছে ২০২৯ সালে।

৮. বিরোধীদের অভিযোগ ও সরকারের পাল্টা যুক্তি

বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রধান রাজনৈতিক মতপার্থক্য কয়েকটি বিষয়ে কেন্দ্রীভূত।


বিষয়আন্দোলনকারী ও বিরোধীদের অবস্থান
সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অবস্থান
ভোটার তালিকা
যোগ্য ভোটার বাদ পড়ার আশঙ্কা ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগভুল বা অযোগ্য নিবন্ধন বাদ দিয়ে তালিকা নির্ভুল করার দাবি
ছাত্র আন্দোলনপরীক্ষা পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও দায় নির্ধারণের দাবিপ্রশ্নপত্র ফাঁসের দায়ীদের বিচারের আশ্বাস
পুলিশি ব্যবস্থাশান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অতিরিক্ত বাধা ও বলপ্রয়োগের অভিযোগআইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আইনসম্মত পদক্ষেপের দাবি
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠাননির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্নরাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান

দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে যে বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি, তা হলো অভিযোগের বাস্তব প্রমাণ, আইনগত প্রক্রিয়া এবং সরকারি সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ।

৯. আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও ভারতের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি

বিশ্বের বৃহত্তম নির্বাচনী গণতন্ত্র হিসেবে ভারতের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ মনোযোগ পায়।

সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ঘিরে জাতিসংঘের স্বাধীন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতিতে নাগরিক স্বাধীনতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

অন্যদিকে ভারত সরকার সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ আইনগত প্রক্রিয়ার প্রশ্ন সামনে এনেছে।

এখানে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের অর্থ এই নয় যে আন্দোলনকারীদের প্রতিটি অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আবার সরকারি প্রত্যাখ্যানের অর্থও এই নয় যে মানবাধিকারসংক্রান্ত উদ্বেগগুলোর স্বাধীন যাচাইয়ের প্রয়োজন নেই।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের গণতান্ত্রিক অবস্থানের জন্য তাই কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ: নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানের ওপর জনআস্থা কতটা অক্ষুণ্ণ থাকছে, নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সুযোগ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তে প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

১০. ভারতীয় সমাজে মোদিবিরোধী অসন্তোষ কতটা বিস্তৃত?

সাম্প্রতিক আন্দোলনের বিস্তৃতি সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রয়েছে।

প্রথমত, ছাত্র ও তরুণদের নেতৃত্ব এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতা। পরীক্ষার অনিয়মের বিরুদ্ধে জুলাইয়ের বিক্ষোভ এবং ভোটার তালিকার বিরুদ্ধে অক্টোবরের আন্দোলন দেখিয়েছে, নতুন প্রজন্ম বিভিন্ন ইস্যুতে সংগঠিত হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, বিক্ষোভের সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সংযোগ বাড়ছে। দিল্লির পাশাপাশি মুম্বাইয়ের আন্দোলনে উদ্ধব ঠাকরে ও রাজ ঠাকরের মতো নেতাদের অংশগ্রহণ এর উদাহরণ। ১২ অক্টোবর ভোটার তালিকা সংশোধনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টমুখী প্রতিবাদ মিছিলও হয়।

তৃতীয়ত, বিক্ষোভকারীদের ভৌগোলিক ও সামাজিক বিস্তার সম্পর্কে সতর্ক মূল্যায়ন প্রয়োজন। স্বাধীন সংঘাত ও প্রতিবাদ পর্যবেক্ষণ সংস্থা ACLED-এর তথ্য উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে, ২০২৬ সালে ভারতে রাজপথের প্রতিবাদ গত এক দশকের তুলনায় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পৌঁছাতে পারে। তবে প্রতিবাদের সংখ্যা এবং সরকারের বিরুদ্ধে সমগ্র জনগণের সমর্থনের মাত্রা এক বিষয় নয়।

চতুর্থত, আন্দোলনের দাবি এখন কেবল ব্যক্তিবিরোধিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি, নাগরিক অধিকার ও বিচারিক প্রতিকারের প্রশ্নগুলো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বাইরেও প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব বহন করছে।

১১. গণতন্ত্রের জন্য সামনে কী কী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন?

ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে কয়েকটি বিষয় পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

ভোটার তালিকা সংশোধনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কীভাবে নিষ্পত্তি করে।

বাদ পড়া যোগ্য ভোটারদের পুনর্নিবন্ধন ও আপিলের সুযোগ কতটা কার্যকর হয়।

বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ এবং আটকসংক্রান্ত অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত হয় কি না।

ছাত্র-যুব আন্দোলন নির্দিষ্ট দাবি আদায়ের পর কতটা সক্রিয় থাকে।

সরকার, বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ কতটা সম্ভব হয়।

এর মধ্যে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ১২ অক্টোবরের সুপ্রিম কোর্টমুখী প্রতিবাদ এবং ২০ অক্টোবর জাতিসংঘের স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের তদন্তের আহ্বান। ঘটনাগুলো দেখায়, রাজপথের বিতর্ক বিচারিক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আলোচনার বিষয়ও হয়ে উঠেছে।

উপসংহার: গণতন্ত্রের প্রশ্নে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক উপস্থিতি

ভারতের সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলন একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতা সামনে এনেছে। সেখানে একদিকে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত জোট সরকার, অন্যদিকে সরকারের বিভিন্ন নীতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তুষ্ট ছাত্র, তরুণ, বিরোধী দল এবং নাগরিক সমাজের একটি অংশ।

এই প্রতিবাদকে শুধু মোদিবিরোধী জনরোষের প্রকাশ হিসেবে দেখলে এর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণগুলো পুরোপুরি বোঝা যাবে না। আবার প্রতিবাদগুলোকে বিচ্ছিন্ন আইনশৃঙ্খলাজনিত ঘটনা হিসেবে দেখলেও ভোটাধিকার, শিক্ষাব্যবস্থা ও নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্নগুলো যথাযথ গুরুত্ব পাবে না।

ভারতের সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজ—সব পক্ষের ভূমিকা এখন বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণযোগ্য।

শেষ পর্যন্ত ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে জনগণের ভোটাধিকার রক্ষা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং শান্তিপূর্ণ ভিন্নমত প্রকাশের সাংবিধানিক সুযোগ নিশ্চিত করা।

ভারতের সাম্প্রতিক আন্দোলন তাই শুধু একটি সরকারবিরোধী প্রতিবাদের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক আস্থা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে চলমান বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।