প্রকাশিত: ২৪ জানুয়ারী ২০২৬ , ০১:৩৭ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের নবম আসর শুরু হতে যখন মাত্র কয়েকদিন বাকি, ঠিক তখনই বিশ্ব ক্রিকেটে এক বিশাল ভূমিকম্প হয়ে এলো আইসিসির চূড়ান্ত ঘোষণা। ২০২৬ সালে ভারত ও শ্রীলঙ্কার মাটিতে অনুষ্ঠিতব্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আর দেখা যাবে না বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলকে। দীর্ঘ টানাপোড়েন আর নাটকীয়তার পর শনিবার সকালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে যে, বাংলাদেশের পরিবর্তে এই আসরে অংশ নেবে স্কটল্যান্ড। আইসিসির বেঁধে দেওয়া ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা পার হওয়ার পর এই চূড়ান্ত ও কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো।
ঘটনার সূত্রপাত ও আইসিসির সিদ্ধান্ত
গত কয়েকদিন ধরেই বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল। ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিতব্য এই মেগা ইভেন্টে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো অন্য কোনো দেশে সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। কিন্তু আইসিসি সাফ জানিয়ে দেয়, বিশ্বকাপের সূচি পরিবর্তন বা ভেন্যু স্থানান্তর কোনোভাবেই সম্ভব নয়। গত ২১ জানুয়ারি আইসিসি বোর্ডের এক সভায় দুই দেশ ছাড়া বাকি সব সদস্য দেশ বাংলাদেশের এই অযৌক্তিক দাবির বিপক্ষে ভোট দেয়। এরপর আইসিসি সিইও সঞ্জোগ গুপ্ত বিসিবিকে ২৪ ঘণ্টার একটি চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেন। শনিবার সেই সময়সীমা পার হওয়ার পর আইসিসি তাদের কঠোর অবস্থান পরিষ্কার করে।
আইসিসি সিইও সঞ্জোগ গুপ্ত আইসিসি বোর্ডের সকল সদস্যকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে জানিয়েছেন যে, বিসিবি আইসিসির নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক অবস্থানে রয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড আইসিসি বোর্ডের সিদ্ধান্ত মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বকাপের পবিত্রতা রক্ষা করতে অন্য একটি দলকে আমন্ত্রণ জানানো ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলামকেও এই সিদ্ধান্তের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে। একই সাথে আইসিসি থেকে ক্রিকেট স্কটল্যান্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বকাপে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
কেন বাদ পড়ল বাংলাদেশ?
বিসিবির আপত্তির মূল জায়গা ছিল নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইসিসির স্বাধীন নিরাপত্তা সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছিল যে, ভারতে বাংলাদেশ দলের জন্য নিরাপত্তার ঝুঁকি 'মাঝারি থেকে কম' (Moderate to Low)। কিন্তু বিসিবি এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে দাবি করে যে, এই ঝুঁকি আসলে 'মাঝারি থেকে উচ্চ' (Moderate to High)। মজার ব্যাপার হলো, গত বছর পাকিস্তানে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলার সময় নিরাপত্তা ঝুঁকি এর চেয়েও বেশি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সেখানে দল পাঠিয়েছিল। আইসিসি মনে করছে, বিসিবি নিরাপত্তা ইস্যুটিকে কেবল অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে এবং ভারতের মাটিতে না খেলার একটি একগুঁয়ে অবস্থান নিয়েছে। আইসিসি সিইও সঞ্জোগ গুপ্ত ক্রমাগত বিসিবির সাথে যোগাযোগ রক্ষা করলেও বাংলাদেশ তাদের অবস্থানে অনড় ছিল। আইসিসি কোনোভাবেই এমন কোনো নজির স্থাপন করতে চায় না যেখানে কোনো সদস্য দেশ তাদের পছন্দ অনুযায়ী বিশ্বকাপের ভেন্যু পরিবর্তনের দাবি জানাতে পারে।
কেন স্কটল্যান্ডকে বেছে নেওয়া হলো?
বাংলাদেশের বিকল্প হিসেবে কেন জিম্বাবুয়ে বা অন্য কোনো দেশকে নয়, বরং স্কটল্যান্ডকে বেছে নেওয়া হলো—সেই প্রশ্ন অনেকের মনেই ছিল। আইসিসি জানিয়েছে, বিগত আইসিসি ইভেন্টগুলোতে পারফরম্যান্স এবং বর্তমান র্যাঙ্কিং (১৪তম) বিবেচনায় স্কটল্যান্ডই ছিল সবার আগে। ২০২৪ সালের বিশ্বকাপে তারা ইংল্যান্ডের সমান পয়েন্ট অর্জন করেছিল কিন্তু নেট রান রেটে পিছিয়ে থাকায় বাদ পড়ে। ২০২১ সালে তারা গ্রুপ পর্বে এই বাংলাদেশকেই হারিয়ে চমক দেখিয়েছিল। তাই সহযোগী দেশগুলোর মধ্যে স্কটল্যান্ডের ধারাবাহিকতা ও শক্তি বিচারে তাদেরই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ক্রিকেট স্কটল্যান্ডের সিইও ট্রুডি লিন্ডব্লেড এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি না দিলেও দুবাই ও এডিনবার্গের মধ্যে হটলাইনে যোগাযোগ শুরু হয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
নতুন সূচি ও স্কটল্যান্ডের পথচলা
বাংলাদেশের জায়গায় এখন স্কটল্যান্ড খেলবে গ্রুপ-সি তে। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে তাদের বিশ্বকাপ অভিযান। এরপর ৯ ফেব্রুয়ারি ইতালির বিপক্ষে এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামবে তারা। এরপর তারা পাড়ি দেবে মুম্বাইয়ে, যেখানে ১৭ ফেব্রুয়ারি তাদের প্রতিপক্ষ নেপাল। কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ইডেন গার্ডেন্সে বাংলাদেশের যে উন্মাদনা থাকার কথা ছিল, তা এখন স্কটিশদের সমর্থনে মুখরিত হবে।
ক্রিকেট বিশ্বে প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশের মতো একটি টেস্ট খেলুড়ে দেশ বিশ্বকাপ থেকে এভাবে ছিটকে যাওয়ায় বিশ্ব ক্রিকেট দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে যেমন আইসিসির অনড় অবস্থানকে অনেকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন বিশ্বকাপের শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য, অন্যদিকে বাংলাদেশের বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী ও বিসিবি চরম হতাশায় নিমজ্জিত। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কেবল একটি টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পড়া নয়, বরং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওপর বড় ধরনের আঘাত। স্পন্সরশিপ থেকে শুরু করে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব হারাবে বিসিবি। অন্যদিকে, স্কটল্যান্ডের জন্য এটি এক বিশাল সুযোগ। সহযোগী দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য তারা এখন মুখিয়ে থাকবে।
ভবিষ্যৎ সংকেত
বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আইসিসির সাথে এই বৈরিতা দীর্ঘমেয়াদে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ এবং অন্যান্য টুর্নামেন্টেও প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি যখন ভারত ও শ্রীলঙ্কায় বিশ্বকাপের পর্দা উঠবে, তখন সেখানে লাল-সবুজের জার্সি না থাকাটা এদেশের ক্রিকেট প্রেমীদের জন্য এক বড় আক্ষেপের কারণ হয়ে থাকবে। আইসিসি তাদের সিদ্ধান্তে পরিষ্কার করে দিয়েছে—ক্রিকেট খেলাটি কোনো একক দেশের খেয়াল-খুশির ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও বিশ্বজনীন কাঠামোর অংশ।
সূচনা থেকে বিদায় পর্যন্ত এই নাটকীয় মোড় বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এখন দেখার বিষয়, বিসিবি তাদের ভুল সংশোধন করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পুনরায় কীভাবে নিজেদের অবস্থান ফিরে পায় এবং স্কটল্যান্ড এই অভাবনীয় সুযোগকে কতটা কাজে লাগাতে পারে।
তথ্যসূত্র: ক্রিকবাজ