প্রকাশিত: ২৬ জুলাই ২০২৬ , ০৯:১৬ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের সিদ্ধান্তটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফল ছিল না। বরং আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগেও তার পদত্যাগ নিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শীর্ষ পর্যায়ে কোনো আলোচনা ছিল না। তবে দ্রুত বদলে যাওয়া রাজনৈতিক ও জনমতের পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত সরকারকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সরকারের অবস্থান পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
প্রথমত, পুলিশের কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও দিল্লিতে চলমান বিক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে ওঠে এবং তা দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। আন্দোলন থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না।
দ্বিতীয়ত, সরকার একের পর এক পদক্ষেপ নিলেও আন্দোলনকারীরা তাতে সন্তুষ্ট হয়নি। শিক্ষা সচিবকে বদলি করা, ফাস্ট ট্র্যাক আদালতের উদ্যোগ, প্রশ্নফাঁস রোধে কঠোর আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া এবং নিট পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থা এনটিএর ৪৭ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার মতো সিদ্ধান্তও পরিস্থিতি শান্ত করতে পারেনি।
তৃতীয়ত, সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন কার্যত অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই অধিবেশনে সীমানা পুনর্বিন্যাস এবং নারী সংরক্ষণ বিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত আইন উত্থাপনের পরিকল্পনা ছিল সরকারের। এসব বিল পাস করাতে বিজেপিকে আগেই ব্যাপক রাজনৈতিক সমর্থন জোগাড় করতে হয়েছে। আন্দোলনের কারণে অধিবেশন ব্যাহত হলে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারত।
গত সোমবার অনশনরত অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুককে দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পর সরকার ধারণা করেছিল, আন্দোলনের গতি হয়তো কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো চিত্র দেখা যায়।
বিজেপির এক সংসদ সদস্য দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে জানান, বৃহস্পতিবার থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শুরু করেন। তরুণদের উদ্দেশে দেওয়া তার ভিডিও বার্তার প্রতিক্রিয়াও বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, দিল্লির পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্যে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হচ্ছে। মুম্বাইয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি এবং ৩০ জন আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পরও বিক্ষোভে অংশগ্রহণ কমেনি।
বিজেপির একটি উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানায়, সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের পরও শিক্ষামন্ত্রীকে ঘিরে জনমতের কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি। তবে তখনও ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এর প্রমাণ পাওয়া যায় শুক্রবার সন্ধ্যায়ও। সেদিন তিনি সংসদে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। যদি পদত্যাগের বিষয়ে আগে থেকে কোনো ইঙ্গিত পেতেন, তাহলে এমন প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন হতো না। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, তার পদত্যাগের সিদ্ধান্তটি একেবারেই শেষ মুহূর্তে নেওয়া হয়।
আন্দোলনের শুরু থেকে বিজেপি এবং মোদি সরকার দাবি করে আসছিল, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দলের নেতাদের আশঙ্কা ছিল, দাবি মেনে নেওয়া হলে বিরোধীরা এটিকে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক ও নৈতিক বিজয় হিসেবে তুলে ধরবে।
তবে আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় দলের ভেতরেও অবস্থান পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর সঙ্গে কথা বলা দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জানিয়েছেন, একপর্যায়ে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদ ছাড়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। বিভিন্ন রাজ্যের নেতারাও মত দেন যে, এই পরিস্থিতিতে তার মন্ত্রী পদে বহাল থাকা বাস্তবসম্মত নয়।
এদিকে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) দাবি পূরণ না হলে দেশব্যাপী বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়।
সব দিক বিবেচনায় শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। আর সেই সিদ্ধান্তের ফলেই শনিবার শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান ধর্মেন্দ্র প্রধান।