প্রকাশিত: ০৯ অক্টোবার ২০২৬ , ০৫:২৭ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ট্রাম্প প্রশাসনের আইস অভিযান নিয়ে নতুন বিতর্ক, ক্ষুব্ধ মেয়র মামদানি
নিউইয়র্ক সিটিতে ফেডারেল অভিবাসন পুলিশের অভিযানের সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ২৮ বছর বয়সী এক যুবক। তাঁর গাড়িতে তখন পাঁচ বছরের একটি শিশু ছিল। ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার ব্রঙ্কসের মার্বেল হিল এলাকায়। আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। শিশুটি শারীরিকভাবে অক্ষত রয়েছে বলে জানিয়েছেন নগরীর মেয়র জোহরান মামদানি।
ঘটনাটি এমন এক সময় ঘটল, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতি এবং দেশজুড়ে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসের অভিযান নিয়ে বিতর্ক চলছে। নিউইয়র্কের মতো অভিবাসীবহুল নগরীতে এই গুলিবর্ষণ নতুন করে জননিরাপত্তা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
কী ঘটেছিল মার্বেল হিলে
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আহত ব্যক্তির নাম অস্কার বেলগাল। তিনি ডোমিনিকান রিপাবলিকের নাগরিক।
নিউইয়র্ক পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, সাদাপোশাকে থাকা কয়েকজন ফেডারেল কর্মকর্তা বেলগালের কাছে যান। কর্মকর্তাদের একজন নির্মাণশ্রমিকদের ব্যবহৃত ধরনের ভেস্ট পরেছিলেন।
বেলগাল গাড়ি পার্ক করার সময় কর্মকর্তারা তাঁর কাছে এগিয়ে আসেন। একপর্যায়ে গাড়িটি সামনে এগোলে একজন কর্মকর্তা সাতটি গুলি ছোড়েন। একটি গুলি বেলগালের কানের নিচে লাগে।
ঘটনার সময় গাড়িতে থাকা পাঁচ বছরের শিশুটি অক্ষত থাকে।
নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ জানিয়েছে, তারা এই ফেডারেল অভিযানে অংশ নেয়নি। তবে গুলিবর্ষণের পর ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, ঠিক কোন পরিস্থিতিতে একজন ফেডারেল কর্মকর্তা সাতটি গুলি ছোড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সেই মুহূর্তে গাড়ির ভেতরে থাকা শিশুটির নিরাপত্তা কতটা বিবেচনা করা হয়েছিল।
গুলিবর্ষণের পূর্ণ পরিস্থিতি এখনো তদন্তাধীন। ফলে গুলি চালানোর আইনগত যৌক্তিকতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার সময় আসেনি।
মেয়র মামদানির কঠোর প্রতিক্রিয়া
নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুতর ও অগ্রহণযোগ্য বলে বর্ণনা করেছেন।
মেয়র জানিয়েছেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ফেডারেল কর্মকর্তারা একটি গাড়ি ঘিরে ফেলার পর গুলি চালান। গাড়িতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে পাঁচ বছরের শিশু ছিল।
মামদানি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলে নিউইয়র্ক সিটিতে আইসের সব ধরনের অভিযান বন্ধের দাবি জানানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় হচ্ছে, অভিবাসন আইন কার্যকর করার নামে নগরীর বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিপন্ন হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
এই অবস্থান ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির সঙ্গে নিউইয়র্ক সিটি প্রশাসনের বিদ্যমান বিরোধকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
ফেডারেল সরকারের বক্তব্য কী
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ বা ডিএইচএস জানিয়েছে, আইস কর্মকর্তারা একজন ডোমিনিকান নাগরিককে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট অভিযান পরিচালনা করছিলেন। ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অতীতে অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার তথ্য রয়েছে বলে দাবি করেছে বিভাগটি।
ফেডারেল কর্তৃপক্ষের যুক্তি, অভিবাসন আইন প্রয়োগ এবং অপরাধের ইতিহাস থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তাদের দায়িত্ব।
তবে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্য বৈধ হলেও অভিযানের সময় ব্যবহৃত বলপ্রয়োগ প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক ছিল কি না, সেটি পৃথক প্রশ্ন।
ডিএইচএস জানিয়েছে, ঘটনার তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত গুলিবর্ষণের সব পরিস্থিতি নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব নয়।
আহত যুবককে হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ
বৃহস্পতিবার রাতের শেষ দিকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেয়র মামদানি জানান, তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি মার্কওয়েন মুলিনের সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে যোগাযোগ করে আহত ব্যক্তিকে মুক্তি দেওয়ার অনুরোধ জানান।
মেয়রের দাবি, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ফেডারেল কর্তৃপক্ষ আহত ব্যক্তিকে হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়।
নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুলও প্রেসিডেন্ট ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারির সঙ্গে যোগাযোগ করে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
এই নতুন তথ্য ঘটনাটিকে কেবল গুলিবর্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। আহত ব্যক্তির চিকিৎসা, ফেডারেল হেফাজতে তাঁর অবস্থান এবং আইনি প্রতিনিধিত্বের সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন সামনে এসেছে।
ঘটনাস্থলে বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
গুলিবর্ষণের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মার্বেল হিল এলাকায় বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীরা আইসের অভিযান বন্ধের দাবিতে স্লোগান দেন এবং আহত ব্যক্তিকে যে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল, সেখানেও জড়ো হন।
হাসপাতালের কাছে রাস্তা অবরোধ ও পুলিশের ব্যারিকেড ঘিরে উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের কয়েকজন পুলিশের দিকে পানির বোতল ছোড়েন। পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে।
স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও ঘটনাস্থলে গিয়ে গুলিবর্ষণের সমালোচনা করেন।
দেশজুড়ে অভিবাসন অভিযানে গুলিবর্ষণ
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের গুলিতে অন্তত ২১ জন আহত বা নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান অভিবাসন অভিযান পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের বিতর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে প্রতিটি গুলিবর্ষণের পরিস্থিতি ও আইনগত মূল্যায়ন পৃথক।
ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য, অপরাধের ইতিহাস থাকা অননুমোদিত অভিবাসীদের গ্রেপ্তার ও বহিষ্কার করা জননিরাপত্তার জন্য জরুরি। অন্যদিকে সমালোচকদের অভিযোগ, অভিযানের পদ্ধতি অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিপন্ন করছে।
বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
নিউইয়র্কে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি অভিবাসীর বসবাস। তাঁদের অনেকেই ব্রঙ্কস, কুইন্স ও ব্রুকলিনে পরিবার নিয়ে বসবাস ও ব্যবসা পরিচালনা করেন।
মার্বেল হিলের ঘটনায় কোনো বাংলাদেশি জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু অভিবাসন অভিযানের সময় কর্মকর্তাদের পরিচয়, গাড়ি থামানোর পদ্ধতি এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নগুলো বাংলাদেশিসহ সব অভিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য প্রাসঙ্গিক।
বিশেষ করে সাদাপোশাকে অভিযান পরিচালনার সময় কর্মকর্তাদের পরিচয় শনাক্ত করা এবং কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে নাগরিক ও অভিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।
অভিবাসন আইন প্রয়োগ করা ফেডারেল সরকারের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। একই সঙ্গে সেই আইন প্রয়োগের পদ্ধতি সাংবিধানিক অধিকার এবং বলপ্রয়োগের প্রযোজ্য আইনগত সীমার অধীন।
এখন সামনে যে প্রশ্ন
এই ঘটনার তদন্তে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাবে। ফেডারেল কর্মকর্তারা নিজেদের পরিচয় যথাযথভাবে দিয়েছিলেন কি না, গাড়িটি সামনে এগোনোর সময় প্রকৃত হুমকির মাত্রা কতটা ছিল, সাতটি গুলি চালানো প্রয়োজনীয় ছিল কি না এবং গাড়িতে শিশুর উপস্থিতি সম্পর্কে কর্মকর্তারা অবগত ছিলেন কি না।
নিউইয়র্ক পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের একটি নিরাপত্তা ক্যামেরায় গুলিবর্ষণের আগের কিছু ঘটনা ধারণ হয়েছে, কিন্তু সরাসরি গুলি চালানোর দৃশ্যটি ধারণ হয়নি।
ফলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, অন্যান্য ভিডিও, ফরেনসিক আলামত এবং ফেডারেল তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নিউইয়র্কের এই ঘটনা আবারও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। অভিবাসন আইন কার্যকর করার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং সেই ক্ষমতা প্রয়োগের সময় সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব কীভাবে সমন্বিত হবে?
মার্বেল হিলের গুলিবর্ষণের তদন্ত সেই প্রশ্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।