এখন সময় রিপোর্ট

প্রকাশিত: ০৮ ডিসেম্বার ২০২৫ , ০৭:০৪ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

নারীজীবনের শ্রেষ্ঠ আদর্শ খাদিজা (রা.): দাম্পত্য জীবনের চার অনুসরণীয় শিক্ষা

ইসলামী ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ নারীদের অন্যতম হলেন মহানবী (সা.)-এর স্ত্রী এবং উম্মাহাতুল মুমিনীন হজরত খাদিজা (রা.)। নবীজির স্ত্রীরা মুসলিম জাতির জন্য মায়ের মতো, তাই তাদের উম্মাহাতুল মুমিনীন বলা হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে মা খাদিজা (রা.) নারীজীবনের এক শ্রেষ্ঠ রোল মডেল।

খাদিজা (রা.)-এর দাম্পত্য জীবনের এমন কয়েকটি গুণ নিচে তুলে ধরা হলো, যা আজকের নারীদের জন্যও অনুসরণীয়:

১. চরিত্রবান জীবনসঙ্গী নির্বাচন

মক্কার সম্ভ্রান্ত ও বিত্তশালী নারী ছিলেন উম্মাহাতুল মুমিনীন খাদিজা (রা.)। প্রথম স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি একাধিক বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কারণ তিনি কেবল বিয়ে করতে চাননি, চেয়েছিলেন একজন চরিত্রবান ও নীতিবান মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে। আল্লাহ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার জন্য সেই মানুষ হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। স্বামী নির্বাচনে এই বিচক্ষণতা তাদের দাম্পত্যকে সুখী ও দৃঢ় করেছিল। ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাপূর্ণ জীবন গড়ার প্রথম শর্ত হলো সঠিক মানুষকে বেছে নেওয়া।

২. বিপদে সান্ত্বনা ও অভয় দিয়ে স্বামীর পাশে থাকা

হেরা গুহায় জিবরাঈল (আ.) যখন প্রথমবার ওহী নিয়ে আগমন করেন, তখন জিবরাঈলের বিশালাকৃতি দেখে মহানবী (সা.) আতঙ্কিত হয়েছিলেন। সেই আতঙ্কিত মন নিয়ে নবীজি (সা.) তাঁর চাচা বা বন্ধুর কাছে না গিয়ে গিয়েছিলেন স্ত্রী খাদিজার (রা.) কাছে।

নবীজি (সা.) খাদিজাকে বিস্তারিত জানিয়ে নিজের জন্য আশঙ্কা প্রকাশ করলে, খাদিজা (রা.) সঙ্গে সঙ্গে স্বামীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, "এমনটা হতে পারে না। আপনি আনন্দিত হোন। আল্লাহ কখনো আপনাকে বিপদে ফেলবেন না। আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, সত্য কথা বলেন, মানুষের দায়িত্ব বহন করেন, অসহায়দের সাহায্য করেন, অতিথি আপ্যায়ন করেন এবং বিপদাপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ান। আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করবেন।"

নবীজি (সা.) যখন আতঙ্কিত ছিলেন, সেই মুহূর্তে এই বাক্যগুলো ছিল ভালোবাসা, সান্ত্বনা ও দৃঢ় আশ্বাসের প্রতীক। এই ঘটনা শিক্ষা দেয় যে একজন স্ত্রী হতে পারে স্বামীর সবচেয়ে বড় মানসিক ভরসা।

৩. প্রজ্ঞাসম্পন্ন পরামর্শদাতার ভূমিকা

শুধু সান্ত্বনা দিয়েই থেমে যাননি খাদিজা (রা.)। সমাধানের জন্য তিনি নবীজিকে জ্ঞানী ও ধর্মশাস্ত্র বিশেষজ্ঞ ওয়ারাকা ইবন নওফেলের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন। ওয়ারাকা পুরো ঘটনা শুনে বিশ্লেষণ করেন এবং ভবিষ্যতবাণীও করে দেন।

এই ঘটনা প্রমাণ করে, একজন স্ত্রী হিসেবে জ্ঞানসমৃদ্ধ হওয়া জরুরি। ইসলাম, সমাজ, চলমান বিষয় সব বিষয়ে জ্ঞান থাকা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে প্রয়োজনে খাদিজা (রা.)-এর মতো বুদ্ধিদীপ্ত, বাস্তবজ্ঞানসম্পন্ন পরামর্শ স্বামীকে দিতে পারেন।

৪. স্বামীর পাশে শক্ত দেয়ালের মতো অবস্থান

নাদরুল মুহাম্মাদ (সা.) স্ত্রী খাদিজা (রা.) সম্পর্কে বলেছেন, "যখন সবাই অবিশ্বাসী ছিল, তখন তিনি (খাদিজা) আমার প্রতি বিশ্বাস রেখেছেন। অন্যরা আমাকে সম্পদ দেয়নি, অথচ তিনি তার সব সম্পদ আমাকে দিয়েছেন। আল্লাহ আমাকে তার মাধ্যমেই সন্তান দান করেছেন, অন্য কারও মাধ্যমে নয়।"

ওহী নাজিলের পর যখন নবীজি (সা.)-এর কষ্টের ধারা শুরু হয়—তাঁকে সমাজ থেকে বিতাড়িত করা হয়, সম্পদ কেড়ে নেওয়া হয়, এমনকি অনাহারে থাকতেও বাধ্য করা হয়েছিল—এই কঠিন মুহূর্তগুলো খাদিজা (রা.) কখনো পিছিয়ে যাননি। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি নবীজির শক্ত স্তম্ভ হয়ে পাশে ছিলেন।

স্বামীর প্রতি আস্থা রাখা, গুজবে কান না দেওয়া, কঠিন সময়ে পাশে থাকা—এগুলো খাদিজা (রা.)-এর শিক্ষা। তাঁর জীবন নারীদের এই শিক্ষা দেয় যে, পৃথিবী যদি স্বামীর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তবুও স্ত্রীর উচিত তার প্রতি সমর্থন দিয়ে যাওয়া।