প্রকাশিত: ২৬ জানুয়ারী ২০২৬ , ০৭:১৪ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ভারতে গিয়ে খেলতে রাজি না হওয়ায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের বাদ পড়ার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার নতুন সংকটে পড়েছেন দেশের ক্রীড়া সাংবাদিকরা। আইসিসি কেবল বাংলাদেশ দলকে আসর থেকে বাদ দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং আসন্ন এই বিশ্ব আসর কাভার করার জন্য আবেদন করা সকল বাংলাদেশি সাংবাদিকের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করে দিয়েছে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। আইসিসির এমন নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের ফলে আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সংবাদ সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশ থেকে কোনো গণমাধ্যমকর্মীর যাওয়ার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেল।
পূর্ব নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচ কলকাতায় এবং একটি ম্যাচ মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত ছিল বলেই আইসিসির বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোর বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডের জন্য আবেদন করেছিলেন। তবে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশ দল ভারত সফরে অসম্মতি জানানোয় আইসিসি তড়িঘড়ি করে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে আসরে অন্তর্ভুক্ত করে। এই পরিবর্তনের পর ধারণা করা হয়েছিল দল না থাকলেও পেশাগত দায়িত্ব পালনে সাংবাদিকরা বিশ্বকাপে যেতে পারবেন, কিন্তু আইসিসি সরাসরি সব আবেদন বাতিল করে সেই আশায় পানি ঢেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এটি একটি নজিরবিহীন এবং বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ যখন প্রথমবার ওয়ানডে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে, তখন থেকেই প্রতিটি বৈশ্বিক আসরে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সরব উপস্থিতি ছিল। এমনকি ১৯৯৯ সালের আগে যখন বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেনি, তখনও দেশের অনেক অভিজ্ঞ সাংবাদিক বিশ্বমঞ্চে উপস্থিত থেকে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। এদেশের সাধারণ মানুষের ক্রিকেটের প্রতি যে প্রবল আবেগ এবং উন্মাদনা, তার কথা মাথায় রেখেই প্রতিটি গণমাধ্যম বিপুল অর্থ ব্যয় করে বিশ্বকাপ কাভার করতে প্রতিনিধি পাঠায়। আইসিসির এই সিদ্ধান্ত সেই দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যে কুঠারাঘাত করেছে।
আইসিসির এই খামখেয়ালি এবং বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেশের ক্রীড়া সাংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। জ্যেষ্ঠ ক্রীড়া সাংবাদিকরা বলছেন, দল না খেলা মানেই কোনো দেশ থেকে সাংবাদিক যেতে পারবে না—এমন কোনো বিধান আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নেই। এটি মূলত সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকারের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ। দেশের বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং দ্রুত এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি তুলেছে। একই সঙ্গে ক্রিকেটের বৃহত্তর স্বার্থে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দেশের আপামর ক্রিকেটপ্রেমী এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সাংবাদিকরা মনে করছেন, আইসিসির এই অনমনীয় অবস্থান কেবল ক্রীড়া সাংবাদিকতার পথকেই বাধাগ্রস্ত করছে না, বরং এশীয় ক্রিকেটে বাংলাদেশের মর্যাদাকেও ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
ক্রীড়া কূটনীতি ও আইনি কাঠামোর বিশ্লেষণে আইসিসির সিদ্ধান্ত
একজন নিরপেক্ষ বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে আইসিসির এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থী। সাধারণত কোনো টুর্নামেন্টে একটি দেশ অংশগ্রহণ না করলেও সেই দেশের সংবাদমাধ্যম সেখানে উপস্থিত থেকে সংবাদ সংগ্রহের অধিকার রাখে। আইসিসির বর্তমান মিডিয়া অ্যাক্রিডিটেশন নীতিমালায় কোথাও স্পষ্ট উল্লেখ নেই যে, একটি দেশ আসর থেকে বাদ পড়লে সেই দেশের সাংবাদিকদেরও নিষিদ্ধ করা হবে। এটি মূলত একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ছায়া বলে প্রতীয়মান হচ্ছে, যা আইসিসির নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং দেশের সাংবাদিক সংগঠনগুলো আইসিসির এথিক্স কমিটির কাছে এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ রাখে। যেহেতু সাংবাদিকদের আবেদনগুলো একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জমা দেওয়া হয়েছিল এবং তখন বাংলাদেশ টুর্নামেন্টের অংশ ছিল, তাই দল পরিবর্তনের দোহাই দিয়ে ঢালাওভাবে সবার কার্ড বাতিল করা অপেশাদারিত্বের পরিচয়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইসিসি এখানে ‘সিলেক্টিভ এন্ট্রি’ বা বাছাইকৃত প্রবেশের নীতি গ্রহণ করেছে, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশের সাংবাদিকদের জন্যও একটি বিপজ্জনক নজির হয়ে থাকবে।
তাছাড়া, বিশ্ববাণিজ্যের প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বাজারগুলোর একটি হলো বাংলাদেশ। বিপুল সংখ্যক দর্শক ও বিজ্ঞাপনদাতার এই বাজারে সাংবাদিকদের উপস্থিতি না থাকা মানে আইসিসির নিজস্ব প্রচার ও বাণিজ্যিক স্বার্থকেও ক্ষুণ্ণ করা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার বর্তমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির জটিলতাকে আইসিসি সমাধান করার পরিবর্তে একতরফা কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এর ফলে ক্রীড়া কূটনীতিতে একটি দীর্ঘস্থায়ী ফাটল তৈরি হতে পারে। এই সংকট নিরসনে বিসিবিকে কেবল নীরব দর্শক না থেকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতের (সিএএস) নজরে বিষয়টি আনা বা আইসিসির বোর্ড সভায় কড়া প্রতিবাদ জানানো প্রয়োজন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।