প্রকাশিত: ১০ নভেম্বার ২০২৫ , ০৫:১৭ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
‘মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ ও নতুন বন্দোবস্তের লক্ষ্যে তারুণ্যের প্রত্যয়’—এই স্লোগান নিয়ে তিন মাস আগে গঠিত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুব উইং ‘জাতীয় যুবশক্তি’। ১৩১ সদস্যের কমিটিতে আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলাম, সদস্য সচিব ডা. জাহেদুল ইসলাম ও মুখ্য সংগঠক হিসেবে আছেন ইঞ্জিনিয়ার ফরহাদ সোহেল।
চলতি বছরের ১৬ মে রাজধানীর গুলিস্তানে শহীদ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউতে (সাবেক বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ) যুব সমাবেশের মাধ্যমে যুবশক্তির আত্মপ্রকাশ ঘটে।
সংগঠনটির চলমান কার্যক্রমসহ সমসাময়িক নানা ইস্যুতে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলাম।
তারিকুল মনে করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীকালে তরুণদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণকে প্রবীণ রাজনৈতিক শক্তিগুলো মন থেকে গ্রহণ করতে পারছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে তরুণরা শ্রেণি বৈষম্যের শিকার।
বাংলা ট্রিবিউন: বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে বিদ্যমান একাধিক যুব সংগঠনের বিপরীতে দেশের যুব সমাজের জন্য যুবশক্তি ব্যতিক্রম কী করতে চায়?
তারিকুল ইসলাম: দায় ও দরদের রাজনীতি, নতুন রাজনৈতিক বন্দবস্ত, নতুন প্রজাতন্ত্র নির্মাণ এবং সব ধর্মের তরুণ-যুবকদের নিয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে কাজ করছে জাতীয় যুবশক্তি। এছাড়া দেশের ভেতরের বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ, ইনসাফ ও সমতার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম, তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, উদ্ভাবনী শক্তি ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগানো, ৪৭-এর আজাদী, ৭১’র স্বাধীনতা সংগ্রাম আর ২৪-এর অভ্যুত্থানকে ধারণ করে আমরা এগিয়ে যেতে চাই।
বাংলা ট্রিবিউন: ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন পরবর্তী রাজনীতিতে তরুণ সমাজের অংশগ্রহণকে স্বাগত জানানো হচ্ছে বলে মনে করেন?
তারিকুল ইসলাম: জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীকালে আমরা মনে করেছিলাম—রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণকে প্রবীণ রাজনৈতিক শক্তিগুলো স্বাগত জানাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কেন যেন তারা আমাদের মন থেকে গ্রহণ করতে পারছে না। কিন্তু প্রকৃত বিষয়টি এমন নয়। এখানে রয়েছে গভীর লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট। যেখানে যুব সমাজ শ্রেণিবৈষম্যের শিকার।
তরুণরা যখন রাজনীতিতে অংশগ্রহণের প্রত্যয় ব্যক্ত করলো, তখন তাদের উচ্চ শ্রেণির রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ মেনে নিতে পারছেন না। শুধু তাই নয়, তাদের অংশগ্রহণকে বিনষ্ট করে গোটা তরুণ সমাজকে রাজনীতিবিমুখ করার সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তরুণদের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করার মতো পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ তুলনামূলক কম।
রাজনীতির মতো ব্যয়বহুল পরিসরে যদি তরুণরা আর্থিক সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে রাজনীতিতে টিকে যায়, সেটি পরবর্তীকালে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতিমুখী করে তুলবে—যা প্রতিষ্ঠিত উচ্চ শ্রেণির রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের স্বার্থে প্রবলভাবে আঘাত হানতে পারে। তাই তরুণরা যেন রাজনীতিতে সফল হতে না পারে, তাই জুলাই অভ্যুত্থানের পর নেতৃত্বে আসা তরুণদের চরিত্র হনন ও তাদের বিরুদ্ধে গুজব-অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। কারণ তরুণরা যদি রাজনীতিতে সফল হয়, তারা রাজনীতিকে নতুন রূপ দেবে এবং নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করবে।
যুবশক্তির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান মঞ্চে দলীয় নেতাদের সঙ্গে তারিকুল ইসলাম
যুবশক্তির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান মঞ্চে দলীয় নেতাদের সঙ্গে তারিকুল ইসলাম
r: আপনারা সহযোগিতামূলক পরিবেশ পাচ্ছেন?
তারিকুল ইসলাম: সত্যি বলতে কী আমরা সে ধরনের সহযোগিতা পাচ্ছি না। আমরা মনে করি, তরুণদের প্রতি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর উদার মনোভাব থাকা উচিত। যেন তারা আগামী দিনে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রশ্ন: বড় রাজনৈতিক যুব সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে দেখা যায়— পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সী নেতারাও মূল দায়িত্বে রয়েছেন। আসলে কত বছর থেকে কত পর্যন্ত যুব সংগঠনে থাকা উচিত?
তারিকুল ইসলাম: পুরোনো রাজনৈতিক সংগঠনগুলো পদ-পদবির প্রলোভনে তরুণ-যুবকদের নিজেদের দিকে ভিড়িয়ে থাকে। অনেক সময় বয়সের ফ্রেম রাখা হয় না। সেখানে প্রকৃতরা স্থান পায় না। আমরা মনে করি, এক্ষেত্রে ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের রাখা উচিত। অথচ বড় দলগুলোর যুব সংগঠনগুলোতে দেখা যায়— তাদের মূল নেতৃত্বে থাকেন ৫৫-৬০ বছর বয়সীরা, যা অনেক সময় অংশগ্রহণমূলক হয় না।
প্রশ্ন: আপনাদের ক্ষেত্রেও কি এমনটি হবে?
তারিকুল ইসলাম: না। আমরা ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়সীদেরই প্রাধান্য দিচ্ছি। আমাদের এখানে ৪০ বছর বয়স হলে একদিনও থাকার সুযোগ নেই। তারা পরবর্তীকালে বৃহত্তর রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে দেশের জন্য আরও অবদান রাখবেন। এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আমরা গর্ব করে বলতে পারি, দেশের প্রকৃত তরুণ-যুবকরাই জাতীয় যুবশক্তিকে প্রতিনিধিত্ব করছে।
প্রশ্ন: আপনাদের আহ্বায়ক কমিটির প্রথম তিন শীর্ষ নেতা পৃথক তিন পেশায় যুক্ত। এর কোনও বিশেষ ব্যাখ্যা আছে?
তারিকুল ইসলাম: জাতীয় যুবশক্তি প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্বশীল জায়গায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। আমরা বিশ্বাস করি— সংগঠনের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের জন্য সব শ্রেণি-পেশার যুব সমাজের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। কারণ, তারাই আগামী দিনে দেশ গড়ায় নেতৃত্ব দেবেন। তাই আমরা শীর্ষ পদে চিকিৎসক, আইনজীবী ও প্রকৌশলীদের স্থান দিয়েছি। যাতে অন্যরা তাদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে নিজেদেরও সেভাবে তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ হন। শুধু তাই নয়, যেকোনও সম্মানজনক পেশার তরুণ-যুবকদের সন্নিবেশ ঘটেছে জাতীয় যুবশক্তিতে। আমরা মনে করি, ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তিতে এই নেতৃত্ব মাইলফলক হিসেবে ভূমিকা রাখবে।
প্রশ্ন: যুবশক্তির কার্যক্রম এনসিপি নিয়ন্ত্রিত হবে, নাকি নিজস্ব সত্তায় চলবে?
তারিকুল ইসলাম: জাতীয় যুবশক্তি গতানুগতিক রাজনৈতিক দলের সহযোগী সংগঠনের মতো কাজ করছে না। বড় দলগুলো তাদের এমন সংগঠনের জনশক্তিকে পেশিশক্তি হিসেবে ব্যবহার করে—যা ইতোমধ্যে পরিলক্ষিত হয়েছে। আমরা তরুণ-তরুণীদের মধ্যে দায় ও দরদের বোধকে জাগ্রত করতে চাই। যেখানে তারা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করবে। দেশের স্বার্থই হবে তাদের কাছে মূল বিবেচ্য।
প্রশ্ন: প্রতিষ্ঠার তিন মাসে জাতীয় যুবশক্তির অর্জন কী?
তারিকুল ইসলাম: চলতি বছরের ১৬ মে আত্মপ্রকাশের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৬৪ জেলা ও সব মহানগরে সমন্বয় সভা করেছে জাতীয় যুবশক্তি। উপজেলা পর্যায়ে সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে সভা-সেমিনারসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। এরই মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে দেশের যুব আলেম ও নারীদের নিয়ে আলাদা দুটি সেমিনার করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ১২ আগস্ট আন্তর্জাতিক যুব দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে প্রথমবারের মতো বৃহৎ পরিসরে ‘জাতীয় যুব সম্মেলন’ করা হয়েছে। সেখানে সারা দেশ থেকে বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণী অংশগ্রহণ করেছেন। এতে বক্তব্য রাখেন জাতীয় যুবশক্তি, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। পাঠ করা হয়েছে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের ৭ দফা ইশতেহার— যার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পুনর্গঠনে কাজ করবে যুব সমাজ।
প্রশ্ন: এ পর্যন্ত কতটি জেলায় আহ্বায়ক কমিটি হয়েছে?
তারিকুল ইসলাম: এখন পর্যন্ত ৫০টি জেলা কমিটি গঠন করা হয়েছে। নেতৃত্বের দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে শিগগিরই তা প্রকাশ করা হবে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য জেলা, মহানগর ও উপজেলা কমিটিও সম্পন্ন হবে।
প্রশ্ন: যুবকদের বেকারত্ব নিরসন ও কর্মসংস্থানে যুবশক্তি কী ধরনের ভূমিকার রাখতে চায়?
তারিকুল ইসলাম: শুধু সভা-সেমিনারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না জাতীয় যুবশক্তি। যুব সমাজের মূল সমস্যা বেকারত্ব নিরসনে অচিরেই ইয়ুথ জব ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে যুব সমাজের কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে বলে আমার বিশ্বাস। এছাড়া তরুণ-তরুণীদের জন্য আমরা ভিন্নধর্মী আরও নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। আশা করি এসব ইতিবাচক কর্মকাণ্ড দেখে তরুণরা রাজনীতিতে আকৃষ্ট হবেন এবং দেশ গঠনে এগিয়ে আসবেন।
প্রশ্ন: আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় যুবশক্তি কী ধরনের ভূমিকা রাখতে চায়?
তারিকুল ইসলাম: নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণপরিষদ নির্বাচন চায় জাতীয় যুবশক্তি। কারণ, বিদ্যমান সংবিধানের আলোকে গত ১৬ বছর দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছিল। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতা উত্তর শেখ মুজিবের শাসনামলেও এমনটি চলছিল। যে সংবিধানের মাধ্যমে কেউ একবার ক্ষমতায় এলে আর ছেড়ে যাওয়ার মতো সহিষ্ণুতা দেখান না, যে সংবিধান প্রণয়ন হয়েছে ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে, যে সংবিধান একটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের মূলনীতির আলোকে তৈরি, যে সংবিধান গত ৫৩ বছরে জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতে ব্যর্থ, সে সংবিধান পরিবর্তন করে গণপরিষদের মাধ্যমে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে।
আমরা চাই নতুন সংবিধানে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা— সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত এবং গণপরিষদ নির্বাচনের পরই জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে হবে। আর জাতীয় নির্বাচনের আগে অবশ্যই মৌলিক সংস্কার, জুলাই গণহত্যার বিচার এবং জুলাই সনদের সাংবিধানিক ভিত্তি নিশ্চিত করতে হবে। যেন ক্ষমতার পালাবদলে কেউ রাষ্ট্র পুনর্গঠন এবং নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রচেষ্টা ব্যাহত করতে না পারে।
প্রশ্ন: আপনাকে ধন্যবাদ।
তারিকুল ইসলাম: আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।