এখন সময় রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১৬ অক্টোবার ২০২৫ , ০৩:৫৯ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

চাকসু নির্বাচন: আদর্শের পুনরুত্থান নাকি রাজনীতির পুনর্বিন্যাস

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচন শুধু একটি ক্যাম্পাস ইভেন্ট নয়, এটি বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির এক ঐতিহাসিক মোড়। প্রায় ৪৪ বছর পর এই নির্বাচনে ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’র বিপুল বিজয় শুধু ক্যাম্পাস রাজনীতির ইতিহাসে নয়, জাতীয় রাজনীতির মানচিত্রেও নতুন বার্তা পাঠিয়েছে।

চাকসুর এই ফলাফলকে বিশ্লেষণ করতে হলে প্রথমে ফিরে যেতে হয় আশির দশকে। ১৯৮২ সালে সর্বশেষ যে নির্বাচনে ছাত্রশিবির প্রভাব বিস্তার করেছিল, তখন বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে নৈতিকতা, আদর্শ ও সংগঠনশৃঙ্খলা ছিল নেতৃত্বের প্রধান মানদণ্ড। পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ধীরে ধীরে ছাত্ররাজনীতিকে দূষিত করে তোলে। পৃষ্ঠপোষকতা, দখল, টেন্ডারবাজি ও প্রশাসনিক আনুগত্য ছাত্রসমাজকে বিভক্ত করে দেয়।

নতুন প্রজন্ম সেই ইতিহাস ভুলে যেতে বসেছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের নির্বাচনে দেখা গেল সম্পূর্ণ বিপরীত এক চিত্র। আদর্শনিষ্ঠ ছাত্রসমাজের প্রতি পুনরায় আস্থা ফিরছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মহল বলছে, এটি কেবল একটি নির্বাচনের ফল নয়, এটি ‘চরিত্রভিত্তিক নেতৃত্বের পুনরুত্থান’।

চাকসুর নির্বাচনে মোট ২৬টি পদে ভোট হয়। এর মধ্যে ২৪টি পদে জয়ী হয় ছাত্রশিবিরের প্যানেল, একটি পদে (এজিএস) জয় পায় ছাত্রদল সমর্থিত প্রার্থী এবং বাকিগুলোতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অপ্রভাবশালী থাকে। ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনগুলোর তুলনায় রেকর্ড।

এবারের নির্বাচনে যে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়: প্রথমত, নির্বাচন প্রক্রিয়া ছিল তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রভাব সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর সরাসরি হস্তক্ষেপের পরিবর্তে আদর্শিক প্রতিযোগিতা দেখা গেছে, যা ভবিষ্যতের ছাত্ররাজনীতির জন্য শুভ ইঙ্গিত।

জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এটি অনেক বড় বার্তা বহন করে। দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক শক্তি, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ যেখানে সংগঠন কাঠামো ও নেতৃত্ব সংকটে ভুগছে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এক আদর্শভিত্তিক সংগঠনের সাফল্য তরুণ সমাজে নতুন প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছে।

অবশ্য সমালোচকরাও আছেন। তারা বলছেন, ছাত্ররাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক পুনরুত্থান নতুন দ্বন্দ্বের সূত্রপাত করতে পারে। কিন্তু সমর্থকরা যুক্তি দেন, যতদিন রাজনীতি চরিত্র, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, ততদিন তা ভয় নয় বরং আশার প্রতীক।

অতএব, চাকসু নির্বাচন ২০২৫ শুধু একটি ক্যাম্পাস ভোট নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন ধারা সূচিত করেছে, যেখানে তরুণরা আবার ভাবতে শুরু করেছে: নেতৃত্ব মানে কর্তৃত্ব নয়, দায়িত্ব; রাজনীতি মানে ক্ষমতা নয়, সেবা।