কাজী রাহাত শামস

প্রকাশিত: ১৩ আগষ্ট ২০২৬ , ০৪:১০ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

এআইয়ের বাংলায় ব্যবহার বাড়ছে, বদলে যাচ্ছে কাজের ধরন

সংবাদ লেখা থেকে শিক্ষা, অনুবাদ, ভয়েস ও দৈনন্দিন কাজ—বাংলা ভাষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে, তবে বাড়ছে নির্ভরতার ঝুঁকিও

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর শুধু ইংরেজি ভাষাভাষী প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশেও বাংলা ভাষায় এআই ব্যবহারের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। সংবাদ লেখা, অনুবাদ, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, তথ্য খোঁজা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট তৈরি, ভয়েস থেকে লেখা তৈরি কিংবা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন নানা কাজে বাংলা ভাষায় এআই ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে বড় ভাষা মডেলভিত্তিক এআই সহকারীগুলো বাংলা প্রশ্ন বুঝতে এবং বাংলায় উত্তর দিতে পারায় প্রযুক্তিটির ব্যবহার আরও সহজ হয়েছে। ফলে প্রযুক্তিগত জ্ঞান কম থাকা ব্যবহারকারীরাও এখন নিজের ভাষায় এআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন।

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমেও এর ব্যবহার ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। ২০২৬ সালের একটি আলোচনায় বাংলাদেশের সংবাদকক্ষগুলোতে অনুবাদ, কনটেন্ট তৈরি, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগের কাজে এআই ব্যবহারের কথা উঠে এসেছে। তবে একই সঙ্গে সম্পাদকীয় তদারকি, তথ্যের নির্ভুলতা ও নৈতিক ব্যবহারের বিষয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

বাংলায় এআইয়ের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার কোথায়?

শিক্ষাক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। শিক্ষার্থীরা কঠিন বিষয় সহজ ভাষায় বোঝা, কোনো অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ তৈরি, প্রশ্ন তৈরি, ভাষা অনুবাদ কিংবা লেখার ভুল সংশোধনে এআই ব্যবহার করছে। শিক্ষকরা পাঠ পরিকল্পনা, শিক্ষাসামগ্রী তৈরি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজেও এর সহায়তা নিচ্ছেন। বাংলাদেশ নিয়ে সাম্প্রতিক একটি গবেষণাতেও শ্রেণিকক্ষে এআইয়ের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের বিষয়টি উঠে এসেছে।

তবে শিক্ষার্থীদের জন্য এখানেই রয়েছে বড় প্রশ্ন। এআই যদি শেখার সহায়ক হয়, তাহলে এটি সময় বাঁচাতে পারে; কিন্তু নিজের চিন্তা ও বিশ্লেষণ বাদ দিয়ে পুরো উত্তর কপি করার অভ্যাস তৈরি হলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সংবাদমাধ্যমে বাংলা এআইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে অনুবাদ। বিদেশি সংবাদ বা ইংরেজি ভাষার নথিকে দ্রুত বাংলায় রূপান্তর করতে এআই সহায়তা দিতে পারে। একইভাবে দীর্ঘ লেখা সংক্ষেপ করা, শিরোনামের খসড়া তৈরি, তথ্য সাজানো এবং সাক্ষাৎকারের বক্তব্য লিখিত রূপ দেওয়ার কাজেও এটি ব্যবহার করা সম্ভব।

ভয়েস প্রযুক্তিতেও বাংলা

বাংলা ভাষায় ভয়েস প্রযুক্তির ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কথাকে লিখিত বাংলায় রূপান্তর, লিখিত তথ্যকে কণ্ঠে পরিণত করা এবং ভয়েস কমান্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বাংলা ভাষা নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণ, যন্ত্র অনুবাদ, বক্তৃতা প্রযুক্তি, অক্ষর শনাক্তকরণ এবং বহুভাষিক মডেলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতির কথা বলা হয়েছে। তবে গবেষকেরা একই সঙ্গে জানিয়েছেন, বাংলা এখনো এআইয়ের দৃষ্টিতে তুলনামূলকভাবে স্বল্প-সম্পদসম্পন্ন ভাষা; মানসম্মত তথ্যভান্ডার, ভাষা-চিহ্নিত তথ্য ও নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাপদ্ধতির ঘাটতি রয়েছে।

শুধু বাংলা লিখলেই কি বাংলা এআই হয়ে যায়?

এখানেই মূল চ্যালেঞ্জ। একটি এআই বাংলায় উত্তর দিতে পারলেই সেটি বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা পুরোপুরি বোঝে—এমনটি নয়।

বাংলাদেশের কথ্য ভাষা, আঞ্চলিক শব্দ, উপভাষা, বানানের বৈচিত্র্য, প্রবাদ-প্রবচন এবং বাংলা-ইংরেজি মিশ্র ভাষা বুঝতে এআইয়ের এখনো সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একই শব্দ ভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। ফলে বাংলা ভাষার পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।

এ কারণে বাংলাদেশে নিজস্ব বাংলা ভাষা মডেল তৈরির উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। জাতীয় এআই নীতির খসড়ায় প্রথম প্রকল্প হিসেবে একটি জাতীয় বাংলা ভাষা মডেল তৈরির পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশে বাংলা ভাষা ও এআই নিয়ে গবেষণার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগও চলছে। সরকারি ব্রেইন ল্যাবের কার্যক্রমে বাংলা ভাষার বড় ভাষা মডেলের ভুল শনাক্তকরণ এবং বাংলাদেশের স্থানীয় সংস্কৃতি ও পরিচয়কে কেন্দ্র করে এআই ব্যবহারের প্রতিযোগিতার কথাও রয়েছে।

সুবিধার পাশাপাশি সতর্কতাও জরুরি

বাংলায় এআইয়ের বিস্তার সাধারণ মানুষের জন্য প্রযুক্তিকে আরও সহজ করে তুলতে পারে। একজন কৃষক নিজের ভাষায় তথ্য জানতে পারবেন, একজন শিক্ষার্থী জটিল বিষয় সহজ করে বুঝতে পারবেন, একজন সাংবাদিক দ্রুত তথ্য সাজাতে পারবেন এবং একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বিপণন বা ব্যবসায়িক লেখালেখিতে সহায়তা নিতে পারবেন।

কিন্তু এআইয়ের দেওয়া তথ্য সবসময় সঠিক হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ভুল তথ্য, বানানো সূত্র, পক্ষপাতদুষ্ট উত্তর কিংবা প্রেক্ষাপটের ভুল ব্যাখ্যা বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সংবাদ, আইন, স্বাস্থ্য বা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এআইয়ের উত্তর যাচাই না করে ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ।

তাই বাংলায় এআইয়ের ভবিষ্যৎ শুধু কত মানুষ এটি ব্যবহার করছে তার ওপর নির্ভর করবে না; বরং কতটা সঠিক, নিরাপদ, স্থানীয় বাস্তবতাসম্মত এবং দায়িত্বশীলভাবে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই হবে বড় প্রশ্ন।

বাংলা ভাষায় এআইয়ের ব্যবহার এখনো শুরুর পর্যায়ে। কিন্তু এর সম্ভাবনা বিশাল। আগামী দিনে বাংলা ভাষার এআই শুধু মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রযুক্তি নয়, বরং শিক্ষা, সংবাদমাধ্যম, ব্যবসা, সরকারি সেবা ও দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সহকারী হয়ে উঠতে পারে।