খেলাধুলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ , ০৩:৪৮ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

অপরাজিত চ্যাম্পিয়নের মুকুট মাথায় তুললো বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল

নেপালের আপার মুলপানি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে তখন উৎসবের আমেজ। মাঠের মাঝখানে বিজয়ীর বেশে দাঁড়িয়ে নিগার সুলতানা জ্যোতি এবং সোবহানা মোস্তারি। গ্যালারিতে উড়ছে লাল-সবুজের পতাকা। নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে স্রেফ উড়িয়ে দিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়নের মুকুট মাথায় তুললো বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল। আগে থেকেই বিশ্বকাপের মূল পর্ব নিশ্চিত হয়ে থাকলেও রবিবারের এই জয়টি ছিল মূলত শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াই। পুরো টুর্নামেন্টে টানা সাতটি ম্যাচে জয়লাভ করে টাইগ্রেসরা বুঝিয়ে দিল, আগামী জুন-জুলাইয়ে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের মাটিতে হতে যাওয়া বিশ্বকাপে তারা কেবল অংশগ্রহণকারী নয়, বরং অন্যতম শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবেই যাচ্ছে।

সকালের কুয়াশা ঘেরা মাঠে টস ভাগ্য সহায় ছিল ডাচদের। টস জিতে আগে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করেননি নেদারল্যান্ডস অধিনায়ক। তবে তাদের সেই সিদ্ধান্ত যে কত বড় ভুল ছিল, তা প্রথম কয়েক ওভারেই প্রমাণ করে দেন বাংলাদেশের বোলাররা। বিশেষ করে অভিজ্ঞ স্পিনার নাহিদা আক্তারের বাঁহাতি স্পিন জাদুতে দিশেহারা হয়ে পড়ে নেদারল্যান্ডসের টপ অর্ডার। দলীয় মাত্র ২৩ রানেই ৫ উইকেট হারিয়ে ডাচরা যখন অল্প রানে গুটিয়ে যাওয়ার শঙ্কায়, তখন দৃশ্যপটে আসেন রবিন রাইক ও সানিয়া খুরানা। এই জুটি বিপর্যয় সামাল দিয়ে ৭৮ রানের একটি লড়াকু পার্টনারশিপ গড়ে তোলেন। তাদের এই দৃঢ়তার ওপর ভর করেই শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ২০ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে ১০২ রান সংগ্রহ করতে সক্ষম হয় নেদারল্যান্ডস।

সানিয়া খুরানা ৩৭ বলে ৪৩ রান করে অপরাজিত থাকলেও রবিন রাইক ইনিংসের শেষ ওভারে ৩৯ রান করে আউট হন। বাংলাদেশের পক্ষে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন নাহিদা আক্তার। ৪ ওভারে একটি মেডেনসহ মাত্র ১০ রান খরচ করে তিনি তুলে নেন ৩টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। এছাড়া মারুফা আক্তার, স্বর্ণা আক্তার এবং রাবেয়া খান একটি করে উইকেট নিয়ে ডাচদের রানের গতি টেনে ধরেন। ১০৩ রানের মামুলি লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই কিছুটা হোঁচট খেয়েছিল বাংলাদেশ। মাত্র ৪ রানের মাথায় ওপেনার দিলারা আক্তার এবং দলীয় ৬ রানের মাথায় জুয়াইরিয়া ফেরদৌস সাজঘরে ফিরলে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হয়। তবে সেই চাপ সুনিপুণভাবে সামাল দেন অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি।

তৃতীয় উইকেটে শারমিন সুলতানা সুপ্তার সাথে ৪২ রানের জুটি গড়েন জ্যোতি। সুপ্তা ব্যক্তিগত ১৩ রানে আউট হলেও চতুর্থ উইকেটে সোবহানা মোস্তারিকে সাথে নিয়ে জয় নিশ্চিত করেন অধিনায়ক। জ্যোতি ৪৪ বলে ৭টি চারের সাহায্যে অপরাজিত ৫০ রানের এক দায়িত্বশীল ইনিংস খেলেন। এটি তার টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের ১১তম ফিফটি। অন্যপ্রান্তে সোবহানা মোস্তারি ২৩ বলে ৩৩ রান করে অপরাজিত থেকে যোগ্য সঙ্গ দেন। পুরো টুর্নামেন্টে সোবহানা ছিলেন দুর্দান্ত ফর্মে। ৭ ম্যাচে ৫২.৪০ গড় ও ১৪৫.৫৫ স্ট্রাইক রেটে ২৬২ রান করে তিনি বাছাইপর্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হিসেবে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ২০ বল হাতে রেখেই ৭ উইকেটের বড় জয় পায় বাংলাদেশ।

এই জয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নারী দল এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছালো। প্রথম রাউন্ডের চার ম্যাচ এবং সুপার সিক্সের তিন ম্যাচ—সব মিলিয়ে টানা সাত ম্যাচে জয় কোনো সহজ কাজ ছিল না। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার কন্ডিশনে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখে অপরাজিত থাকাটা বিশ্বকাপের আগে দলের আত্মবিশ্বাস কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে। কোচিং স্টাফ থেকে শুরু করে ক্রিকেট বোর্ড, সকলেই মেয়েদের এই সাফল্যে আনন্দিত। বিশ্বকাপের মূল পর্বে ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো শক্তিশালী দলগুলোর মুখোমুখি হতে হবে বাংলাদেশকে। নেপালের এই জয় সেই কঠিন মিশরের আগে একটি শক্তিশালী মহড়া হিসেবে কাজ করল।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

নেদারল্যান্ডস নারী দল: ২০ ওভারে ১০২/৬ (সানিয়া ৪৩*, রবিন ৩৯, ডে লেডে ৪; নাহিদা ৩/১০, মারুফা ১/১৪, স্বর্ণা ১/১৭, রাবেয়া ১/২৬)

বাংলাদেশ নারী দল: ১৬.৪ ওভারে ১০৫/৩ (জ্যোতি ৫০*, সোবহানা ৩৩*, সুপ্তা ১৩; হিদার সিগার্স ১/৯, আইরিস ১/১৬, লান্ধির ১/১৭)

ফলাফল: বাংলাদেশ নারী দল ৭ উইকেটে জয়ী ও অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন।

এই জয়ের পর নিগার সুলতানা জ্যোতি জানান, দলের প্রতিটি সদস্য তাদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে নাহিদার বোলিং এবং সোবহানার ধারাবাহিক ব্যাটিং ছিল চোখে পড়ার মতো। এখন লক্ষ্য ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে হতে যাওয়া বিশ্বকাপের মূল মঞ্চ। সেখানেও এই জয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকা উঁচিয়ে ধরতে চায় বাঘিনীরা। গোটা জাতি এখন অধীর অপেক্ষায় আছে জুন-জুলাইয়ের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য।