এখন সময় ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ জুলাই ২০২৬ , ১১:৫০ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

'চিকেনস নেক' এর নিরাপত্তা জোরদারে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, শিলিগুড়িতে যাচ্ছেন অমিত শাহ

ভারতের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’-এর নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যোগ দিতে যাচ্ছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শনিবার উত্তরকন্যায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শাখা সচিবালয়ে অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠকে নিরাপত্তা বাহিনী, রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং তাঁর মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যও এতে অংশ নিতে পারেন।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের একমাত্র স্থল সংযোগ হিসেবে শিলিগুড়ি করিডরের কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি। নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যবর্তী প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডরের সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার। ভারত, চীন ও ভুটানের ত্রিসীমানার কাছাকাছি অবস্থানের কারণে অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বৈঠকে বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের অগ্রগতি এবং শিলিগুড়ি করিডরসংলগ্ন সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হবে বলে জানিয়েছে রাজ্য পুলিশের একটি সূত্র। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দিতে পারেন অমিত শাহ।

ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এই অঞ্চলের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও চীনকে ঘিরে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও কৌশলগত উদ্যোগ নয়াদিল্লির নজরে রয়েছে। চীনের সহায়তায় বাংলাদেশের লালমনিরহাটের পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটি উন্নয়নের পরিকল্পনা এবং তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ-চীনের সহযোগিতা ভারতের নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লালমনিরহাটের বিমানঘাঁটিটি শিলিগুড়ি করিডরের খুব কাছাকাছি অবস্থিত। অন্যদিকে, সিকিম থেকে উৎপন্ন হয়ে শিলিগুড়ি করিডর অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করা তিস্তা নদীকে ঘিরে সম্ভাব্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পও ভারতের কৌশলগত হিসাব-নিকাশে গুরুত্ব পাচ্ছে।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ২ হাজার ২১৭ কিলোমিটার। দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তের কিছু অংশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ নিয়ে জটিলতা থাকলেও নতুন রাজ্য সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিএসএফের কাছে প্রায় এক হাজার একর জমি হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এর ফলে সীমান্ত অবকাঠামো নির্মাণের কাজ আরও দ্রুত এগোবে বলে মনে করা হচ্ছে।

শুধু সীমান্ত নিরাপত্তাই নয়, শিলিগুড়ি করিডরে যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নেও গুরুত্ব দিচ্ছে ভারত সরকার। করিডরের একটি অংশে ভূগর্ভস্থ রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত রেললাইন নির্মাণ, বাগডোগরা বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ এবং হাসিমারা বিমানঘাঁটির আধুনিকায়নের কাজও এগিয়ে চলছে। হাসিমারায় ভারতীয় বিমানবাহিনীর রাফাল যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া অঞ্চলটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্পও বাস্তবায়নাধীন।

শুক্রবার শিলিগুড়িতে পৌঁছে বিএসএফের উত্তরবঙ্গ ফ্রন্টিয়ার সদর দপ্তরে রাত্রিযাপন করবেন অমিত শাহ। শনিবার তিনি বিএসএফের একটি সীমান্ত চৌকি পরিদর্শন করবেন এবং সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। এ সময় কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও উদ্বোধন করারও কথা রয়েছে।

পরে উত্তরকন্যায় তিনি একাধিক প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক বৈঠকে অংশ নেবেন। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের নতুন 'গুন্ডা আইন' বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনাও রয়েছে।

রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শিলিগুড়ি করিডরকে ঘিরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে নিরাপত্তা বাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনের এমন উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় বৈঠক এই অঞ্চলের প্রতি নয়াদিল্লির বিশেষ গুরুত্বেরই প্রতিফলন। একই সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় শিলিগুড়ি করিডরের গুরুত্ব যে আরও বেড়েছে, এই বৈঠক সেটিই স্পষ্ট করে তুলছে।