প্রকাশিত: ২৯ নভেম্বার ২০২৫ , ০১:১৭ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
যুক্তরাষ্ট্র আরও ৩৯ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে। শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে একটি বিশেষ সামরিক ফ্লাইটে তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। এই প্রত্যাবাসনের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানো বাংলাদেশির সংখ্যা ২২০–এর বেশি হলো।
ফেরত আসা এই অভিবাসীদের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ব্র্যাক তাৎক্ষণিক সহায়তা ও পরিবহন সুবিধা প্রদান করেছে।
ফেরত আসা ৩৯ জনের মধ্যে ২৬ জনের বাড়িই নোয়াখালীতে। এছাড়া কুমিল্লা, সিলেট, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরের দুজন করে এবং চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ ও নরসিংদী থেকে একজন করে রয়েছেন।
ব্রাজিল থেকে মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, ফেরত আসাদের মধ্যে ৩৪ জন বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) ছাড়পত্র নিয়ে বৈধভাবে ব্রাজিলে গিয়েছিলেন। পরে সেখান থেকে মেক্সিকো হয়ে তারা অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। বাকি পাঁচজনের মধ্যে দুজন সরাসরি এবং তিনজন দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের আবেদন করলে আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।
এজেন্সির জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান এই ঘটনা প্রসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, সরকার বা এজেন্সির পক্ষ থেকে ব্রাজিলে বৈধভাবে কর্মী পাঠানোর অনুমতির ক্ষেত্রে এই কর্মীরা ব্রাজিল না যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন, তা নিশ্চিত করার কোনো সতর্কতা বা কৌশল ছিল কি না।
তিনি বলেন, যে সব কর্মী ৩০-৩৫ লাখ টাকা খরচ করে শূন্য হাতে ফিরলেন— এর দায় কার? যেসব এজেন্সি তাদের পাঠিয়েছে এবং যারা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া জোরদার
ফেরত আসা যাত্রী ও বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, এর আগে ফেরত পাঠানো বাংলাদেশিদের হাত-পায়ে শিকল পরিয়ে আনা হলেও এবার সেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর অবৈধ অভিবাসী প্রত্যাবাসন কার্যক্রম আরও কড়াকড়িভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এ ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশিসহ বহু দেশের নাগরিককে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
চলতি বছরের ৮ জুন ৪২ জন বাংলাদেশি এবং মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে আরও অন্তত ৩৪ জনকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। মার্কিন আইনে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থান করলে আদালতের রায় বা প্রশাসনিক নির্দেশে অভিবাসীদের দেশে ফেরত পাঠানো যায়। আশ্রয় আবেদন বাতিল হলে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) দ্রুত প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করে। এ কারণে সাম্প্রতিক সময়ে চার্টার্ড ও সামরিক ফ্লাইটের ব্যবহার বেড়েছে।
প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণ: রুট পরিবর্তন ও মানব পাচারের নতুন চক্র
যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশিদের এই গণ-প্রত্যাবাসন কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি দক্ষিণ আমেরিকার বিপজ্জনক পথ ধরে অবৈধ অভিবাসনের এক গভীর সংকটের চিত্র তুলে ধরে। মূলত দুটি মৌলিক প্রশ্ন এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উঠে আসে: এক) অভিবাসনের রুট পরিবর্তন এবং দুই) মানব পাচারের দায় কার?
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে প্রবেশের জন্য মধ্যপ্রাচ্য বা সমুদ্রপথ ব্যবহৃত হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রাজিলে বৈধ কাজের ভিসা নিয়ে প্রবেশের পর সেখান থেকে মেক্সিকোর দুর্গম ও বিপজ্জনক পথ পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর প্রবণতা বেড়েছে। ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, ফেরত আসা বেশিরভাগ কর্মীই বিএমইটি ছাড়পত্র নিয়ে বৈধভাবে ব্রাজিলে গিয়েছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে, বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়াকে মানব পাচারকারীরা কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে। যেসব এজেন্সি বৈধ ভিসার আড়ালে কর্মীদের চূড়ান্ত গন্তব্য সম্পর্কে ভুল তথ্য দিচ্ছে বা এই বিপজ্জনক রুটে উৎসাহিত করছে, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।
এছাড়াও, মার্কিন প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে আশ্রয় আবেদন বাতিল হওয়া বাংলাদেশি অভিবাসীদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সামরিক ফ্লাইটের ব্যবহার বৃদ্ধি ইঙ্গিত দেয় যে, অবৈধ অভিবাসী সমস্যা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র আরও বেশি কঠোর এবং দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে এজেন্সিগুলোর কার্যকলাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ রুটগুলো সম্পর্কে কর্মীদের সচেতন করা। একইসাথে, শূন্য হাতে ফেরা এই কর্মীদের পুনর্বাসন এবং বিপুল অঙ্কের অর্থ ক্ষতির দায়ভার নির্ধারণ করাও জরুরি।